প্রাচীন যুগের ইতিহাস

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ইতিহাস বা আদি যুগ (৬৫০-১২০০ খ্রি)

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ইতিহাস (৬৫০-১২০০ খ্রি.) একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই সময়ে সাহিত্য শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ফুটিয়ে তোলে না, বরং ধর্ম, সমাজ ও ভাষার সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল। প্রাচীন যুগের ইতিহাস টপিকটি পাঠ করলে তোমরা শিখতে পারবে চর্য্যাপদের আবিষ্কার, লুইপা, কাহ্নপা ও ভুসুকুপার মতো কবিদের পরিচয়, তাদের রচনাকাল এবং ভাষাতত্ত্বের সূক্ষ্ম দিকগুলো। এই পোস্টে আমরা সেই প্রাচীন যুগের ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছি এবং তোমাদের জন্য ফ্রি PDF আকারে বিস্তারিত নোটও তৈরি করেছি। তাহলে চলো, শুরু করি।


প্রাচীন যুগের ইতিহাস বা আদি যুগ (৬৫০-১২০০ খ্রি)

চর্যাপদের আবিষ্কার, আবিষ্কারক ও প্রকাশ

বিষয়সময়কাল ও তথ্য
প্রথম ধারণা প্রকাশ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁর “Sanskrit Buddhist Literature in Nepal” গ্রন্থে প্রথম বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের ধারণা প্রকাশ করেন।
চর্য্যাপদ আবিষ্কার১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) নেপালের রাজদরবারের রয়্যাল লাইব্রেরি থেকে চর্যাপদের সঙ্গে সরহপাদের দোহা, কাহ্নপাদের দোহা ও ডাকাবর্ন নামে আরও তিনটি পুথি আবিষ্কার করেন।
প্রকাশকাল১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা” নামে এটি প্রকাশিত হয়।

চর্যাপদের রচনাকাল

বিশেষজ্ঞের মতেচর্য্যাপদের রচনাকালচর্য্যাপদের বয়স (প্রায়)
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্৬৫০-১২০০ খ্রি.১৩৬৬ বছর
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়৯৫০-১২০০ খ্রি.১০৬৬ বছর
ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী ও ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মতেখ্রিষ্টীয় দশম-দ্বাদশ শতক
সুকুমার সেনের মতেদশম হতে মধ্য-চতুর্দশ শতাব্দী
সর্বসম্মতিক্রমেদশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে

চর্যাপদের কবি পরিচিতি

চর্য্যাপদে কবির সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, ড. সুকুমার সেনের “বাঙালা সাহিত্যের ইতিহাস” (১ম খণ্ড) অনুযায়ী ২৩ জন কবির নাম পাওয়া যায়। তবে মতান্তরে কবির সংখ্যা ২৪ জন

চর্য্যাপদের ২৩ জন কবি:

আর্যদেব পা, কঙ্কণপা, কম্বলাম্বরপা, কাহ্নপা, কুত্ত্বরীপা, গুন্ডরীপা, চাটিল্পা, জয়ানন্দীপা, চেঙ্গপা, ডোম্বীপা, তন্ত্রীপা, তাড়কপা, দারিকপা, ধর্মপা, বিরূপা, বীণাপা, ভাদেপা, ভুসুকুপা, মহীধরপা, লাড়িডোম্বী, লুইপা, শবরপা, শান্তিপা, সরহপা

কবি ও তাদের রচিত পদের সংখ্যা

কবির নামপদ সংখ্যারচিত পদ (পদ নং)
কাহ্নপা১৩টি৩, ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৫, ১৮, ১৯, ২৪ (পাওয়া যায় নি), ৩৬, ৪০, ৪২, ৪৪ নং
ভুসুকুপা৮টি৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ নং
সরহপা৪টি২২, ৩২, ৩৮, ৩৯ নং
কুত্ত্বরীপা২টি২, ২০, ৪৮নং
শান্তি পা২টি১৫ ও ২৬নং
শবরপা২টি২৮ ও ৫০নং
লুইপা২টি১ ও ২৯নং
আর্যদেব পা১টি৩১নং
কঙ্কণপা১টি৪৪নং
কম্বলাম্বরপা১টি৮নং
গুন্ডরীপা১টি৪নং
চাটিল্পা১টি৩৩নং
চেঙ্গপা১টি৩৯নং
ডোম্বীপা১টি১৪নং
তাড়কপা১টি৩৭নং
দারিকপা১টি১৭নং
বীণাপা১টি১৭নং
মহীধরপা১টি১৫নং
ভাদেপা১টি৩৫নং
জয়ানন্দীপা১টি৪৬নং
ধর্মপা১টি১৭নং (এটি পাওয়া যায় নি)
লাড়িডোম্বীপা১টি(কোন পদ পাওয়া যায় নি)
তন্ত্রীপা১টি৩৯নং

কয়েকজন কবির পরিচয়

কবির নামপরিচিতি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
লুইপাআদি চর্যাকার: চর্য্যাপদের আদি চর্যাকার মনে করা হয়। তিনি ১ নং ও ২৯ নং পদের রচয়িতা। পরিচিতি: হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের লোক। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, লুইপা ছিলেন শবরপার শিষ্য (৬৫০-৬৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে)। অন্যান্য গ্রন্থ: “অভি সময়বিভঙ্গ”, “বজ্রপাত”, “সাধন”, “বুদ্ধোদয়”, “ভগবদভিসার” ও “তত্ত্ব স্বভাব”।
শবরপাসময়কাল: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, তাঁর জীবনকাল ৬৫০ থেকে ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। প্রাচীন কবি: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আরও মনে করেন শবরপা কবিদের মধ্যে প্রাচীন কবিগুরু/শিষ্য: তিনি লুইপার গুরু এবং নাগার্জুনের শিষ্য ছিলেন। রচিত পদ: তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ২টি (২৮ ও ৫০ নং পদ)অন্যান্য তথ্য: তিনি বীরুপাকে কম্বলাম্বরীকে “ডাকিনী-বজ্র-গীথি” ও “মহামুদ্রোপদেশ” নামক দুটি গ্রন্থ লিখতে সাহায্য করেছিলেন।

কাহ্নপা (Krishnacharya)

বিভাগতথ্য
সময়কালখ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের কবি বলে ধারণা করা হয়।
আসল নামতাঁর আসল নাম কৃষ্ণচার্য
গুরুত্বচর্য্যাপদের প্রধান কবি হিসেবে বিবেচিত। চর্য্যাপদের কবিদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ
আবাসস্থলঐতিহাসিকরা তাঁকে উড়িষ্যার অধিবাসী মনে করলেও, বাংলা সাহিত্যের গবেষক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য তাঁকে নেত্রকোণার অধিবাসী বলে প্রমাণ করেছেন।
স্থানপরিণত বয়সে তিনি সোমপুর বিহারের বিখ্যাত আচার্য ছিলেন।
রাজত্বকালরাজা ধর্মপাল ও রাজা দেবপালের রাজত্বকালে তিনি বর্তমান ছিলেন।
রচিত পদ১৩টি পদ উদ্ধার হয়েছে (তার মধ্যে ২৪ নং পদটি পাওয়া যায় নি)। পদগুলো হলো: ৩, ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৫, ১৮, ১৯, ৩৬, ৪০, ৪২ নং।
ভাষাতাঁর পদে অপভ্রংশ ভাষার একটি দোষ আছে এবং এটি ৩৬টি চর্য্যাগান সংকলনে সংরক্ষিত হয়েছে।
গুরুতাঁর গুরু ছিলেন জালন্ধরীপা। তাঁর অন্য নাম ছিল হাডিপা
উপাধিসম্প্রদায়গতভাবে ব্রাহ্মণ হলেও সহজিয়া মতের দীক্ষা নিয়ে সিদ্ধাচার্যমহাচার্য উপাধিতে ভূষিত হন।


আরো পড়ুন: বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ


কুত্ত্বরীপা (Kukkurippa)

বিভাগতথ্য
সময়কালখ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে তাঁর জন্ম বলে মনে করা হয়।
আবাসস্থলতিব্বতের কাছাকাছি কোনো অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
পরিচিতিড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, তিনি বাংলাদেশেরই অধিবাসী। সুকুমার সেন মনে করেন, কুত্ত্বরীপার ভাষায় নারীদেহের ভাষার মিল আছে, তাই তিনি নারী কবিও হতে পারেন।
রচিত পদ২টি পদ (২ নং ও ২০ নং পদ)। ৪৮ নং পদটি পাওয়া যায় নি।
ভাষার বৈশিষ্ট্যবিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর পদগুলো তুলনামূলকভাবে গ্রাম্য ও ইতর ভাষার

আর্যদেবপা (Āryadeva)

বিভাগতথ্য
সময়কালখ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের প্রথমার্ধের কবি ছিলেন।
আসল নামতাঁর প্রকৃত নাম ছিল আজদেব
জন্মস্থানতিনি সিংহলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলতঃ মেবারের রাজা ছিলেন।
অন্যান্য তথ্যতিনি কম্বলাম্বরপার সমসাময়িক ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। পরে গোরক্ষনাথের কাছে বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা লাভ করে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
রচিত পদচর্যার ৩১ নং পদের রচয়িতা।
ভাষাতাঁর রচিত পদের ভাষা বাংলা ও উড়িয়া মিশ্রিত

কঙ্কণপা (Kankaapā)

বিভাগতথ্য
সময়কালখ্রিষ্টীয় নবম শতকের শেষভাগের কবি বলে ধারণা করা হয়।
পূর্ব জীবনপ্রথম জীবনে তিনি বিষ্ণুপুরের রাজা ছিলেন।
গুরুপরবর্তীকালে তাঁর গুরু কম্বলাম্বরপার কাছ থেকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে সিদ্ধ হন।
রচিত পদচর্যার ৪৪ নং বৌদ্ধ গানটি রচনা করেন।
ভাষাতাঁর পদের ভাষা ছিল বাংলা ও অপভ্রংশ মিশ্রিত

কম্বলাম্বরপা (Kambalāmbara)

বিভাগতথ্য
সময়কালআনুমানিক ৭৫০ থেকে ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।
আবাসস্থলঅনেকে মনে করেন তিনি উড়িষ্যা কিংবা পূর্ব ভারতবাসী ছিলেন।
পরিচিতিতিনি কম্বলারামের রাজপুত্র এবং দেবপালের রাজত্বকালে বর্তমান ছিলেন। চর্যায় তিনি ভিক্ষু ও সিদ্ধা হিসেবে পরিচিত।
গুরুত্বতিনি প্রাচীন বাংলায় বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেন।
রচিত পদচর্যার ৮ নং বৌদ্ধ গানটি তাঁর রচিত।
অন্যান্য তথ্যধারণা করা হয় তিনি জালন্ধরীপার গুরু ছিলেন।

জয়ানন্দীপা (Jayanandi)

বিভাগতথ্য
সময়কালসম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
আবাসস্থলজানা যায় তিনি বাংলাদেশের কোনো এক নাগসবায় মণ্ডলী ছিলেন।
আসল নামতাঁর আসল নাম জয়ানন্দ। তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন।
রচিত পদচর্যার ৪৬ নং পদটি তিনি রচনা করেন।
ভাষাতাঁর ভাষা ছিল গৌড় অপভ্রংশের পরবর্তী আধুনিক আর্যভাষার প্রাচীন রূপ, যা ছিল মৈথিলী, উড়িয়া, বাংলা ও আসামি বাংলার সংমিশ্রণ

চেঙ্গপা (Cegapā)

বিভাগতথ্য
সময়কালখ্রিষ্টীয় নবম শতকে তিনি বর্তমান ছিলেন। অর্থাৎ তিনি দেবপাল-বিগ্রহপালের সমকালে বর্তমান ছিলেন।
আসল নামতাঁর আসল নাম চেঙ্গস
জন্মস্থানঅরঙ্গনগরের উজ্জনীয়ীতে জন্মগ্রহণ করেন।
রচিত পদতিনি চর্যার ৩৩ নং পদটি রচনা করেন।
পদের বিষয়বস্তুতাঁর পদে বেদেদের দুঃখের কথা, খাটের কথা, মাদল বাজিয়ে বিয়ে উৎসবে পালন, নববধূ নাক-কানের দুল পরার কথা, সর্বোপরি বাঙালি জীবনের দারিদ্র্যের চিত্র পাওয়া যায়।

ডোম্বীপা (ombīpā)

বিভাগতথ্য
সময়কালতাঁর জীবনকাল মোটামুটি ৯৫০-৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বলে মনে করা হয়।
পরিচিতিধারণা করা হয় ডোম্বীপা ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছিলেন হেরুক ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা।
ধর্মান্তরবৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়ে যখন দেশ ছেড়ে বনে জঙ্গলে ঘুরতে শুরু করেন তখন তাঁর নাম হয় ডোম্বীপা
গুরু ও সঙ্গীবিরূপা ছিলেন তাঁর গুরু। তাঁর সঙ্গী ছিল ডুমনি নামক এক ডোম জাতীয় পত্নী।
রচিত পদচর্যার ১৪ নং গানটি রচিত।
অন্যান্য তথ্যতিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করায় প্রজারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এরপর দেশে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী শুরু হয়। তিনি দেশে ফিরে এসে রাজাকে বর্মদান করতে অনুরোধ করেন এবং বৌদ্ধধর্মের দীক্ষালাভ করান।

গুন্ডরীপা (Guṇḍarīpā)

বিভাগতথ্য
আবাসস্থলতিনি বাংলা বা বিহারের লোক ছিলেন বলে মতভেদ আছে।
রাজত্বকালরাজা দেবপালের রাজত্বকালে (৮০৯-৮৪২ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি বর্তমান ছিলেন বলে মনে করা হয়।
রচিত পদতিনি চর্য্যাপদের ৪র্থ পদটি রচনা করেন।
পদের অংশ“জোইনি তিঁহু বিনু খনহি না জিবমি।/ তো মহ চুমি কম্লল পিব্মি।”

চাটিল্পা (Cāṭilpā)

বিভাগতথ্য
সময়কালতিনি ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ ভারতে জীবিত ছিলেন বলে মনে করা হয়।
রচিত পদচর্যার ৩৩ নং পদটি তাঁর রচিত।
পদের বৈশিষ্ট্যতাঁর পদে সরল জনসূলভ বক্তব্য ও নীতিমূলক অঞ্চলের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।

আরো কবিদের পরিচয়

কবির নামসময়কাল ও পরিচিতিরচিত পদগুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সরহপাদশম ও একাদশ শতকের কবি। জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু পরে ভিক্ষু ও সিদ্ধ হন। তিনি অলোকিক ক্ষমতার কবি।৪টি পদ। ৪৯ নং পদে নৌকা ও এপার-ওপার যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে।পূর্ববঙ্গের রাজাদের দেশে (উদয়বন্দ), কামরূপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পদাবলীর ভাষা ছিল বজ্রগীতি। কামরূপের রাজা ইন্দ্রভূতি ছিলেন তাঁর শিষ্য।
ভুসুকুপাপূর্ব বাংলার কবি। আসল নাম শান্তিদেব। অষ্টম থেকে একাদশ শতকের সৌরাষ্ট্রের রাজা কল্যাণবর্মার পুত্র ছিলেন।৮টি পদ (৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ নং)। চর্যাপদের রচনায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন।নিজেকে বাঙালি বলে দাবি করেছেন। তিনি একজন রাজপুত্র ছিলেন, কিন্তু তাঁকে উপহাস করে ‘ভুসুকু’ নামে ডাকা হত। শেষ জীবনে নালন্দা বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে ছিলেন।
বিরূপাঅষ্টম শতকের কবি বলে ধারণা করা হয়। রাজা দেবপালের রাজ্যে ত্রিপুরায় জন্মগ্রহণ করেন।চর্যাপদের তৃতীয় পদটি তাঁর রচিত।তিনি জালন্ধরীপার শিষ্য। অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। মদ্যমাংস ভোজনের অপরাধে বিহার থেকে বিতাড়িত হন। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, তিনি ভিক্ষুরূপে সোমপুর বিহারে বাস করতেন।
বীণাপাখ্রিষ্টীয় নবম শতকের লোক। ডোম্বীপার সমসাময়িক। গাঙুর-গৌড় অঞ্চলে এক ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণ করেন।চর্যার ১৭ নং পদটি রচনা করেন।বীণা তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র হওয়ায় তাঁর নাম বীণাপা। তাঁর চর্যাপদের ভাষা ছিল বাংলা। তিনি প্রাচীন বাংলায় গীত রচনার পাশাপাশি বজ্রডাকিনীপক্রিম নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
ভাদেপাখ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান মণিপুরচর্যার ৩২ নং বৌদ্ধ গানটি তিনি রচনা করেন।ভিক্ষু পাল ও নারায়ণ পালের সময় বর্তমান ছিলেন। তিনি চর্যার সুপ্রসিদ্ধ নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা লাভের পর সিদ্ধ হন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, তিনি কাহ্নপার শিষ্য
তন্ত্রীপাসম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। রাহুল সাংকৃত্যায়ন-এর মতে, তাঁর আসল নাম নাড়ুপাদচর্যার ১৭ নং পদটি রচনা করেন।
দারিকপাখ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের শেষভাগ ও নবম শতকের শুরুতে জীবিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃত নাম ইন্দ্রপাল। উড়িষ্যার সালিপুত্রে জন্মগ্রহণ করেন।চর্যার ৩৪ নং বৌদ্ধ গানটি রচনা করেন। পদটি প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত।তিনি লুইপার সাক্ষাৎ শিষ্য নন, শিষ্য পরম্পরার একজন। তাঁর রচিত দুটি গ্রন্থ: তত্ত্বাধিকারসপ্তম সিদ্ধান্ত
ধর্মপাখ্রিষ্টীয় নবম শতকের শুরুর দিকে তাঁর জন্ম। তিনি প্রায় ৮৭৫ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তিনি বিক্রমপুরের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।চর্যার ৪৭ নং পদটি রচনা করেন।তিনি বজ্রব্জা, রূপা, ও নারায়ণ পালের সময় জীবিত ছিলেন। তিনি চর্যার সর্বশেষ কবি এবং চেঙ্গপার সমসাময়িক ছিলেন। তিনি কাহ্নপার শিষ্য
মহীধরপাখ্রিষ্টীয় নবম শতকে পাল রাজা বিগ্রহ পাল ও নারায়ণ পালের রাজত্বকালে বর্তমান ছিলেন।চর্যার ১৬ নং পদটি রচনা করেন।তিনি ত্রিপুরার অধিবাসী ছিলেন (যা সে সময় ত্রিপুরা মগধ অঞ্চলের মধ্যে ছিল)। তিনি কাহ্নপার শিষ্য এবং কাহ্নপার সাথে চট্টগ্রামে ভ্রমণ করেন। তিনি প্রাচীন মৈথিলী ভাষা ব্যবহার করেছেন।
শান্তি পাশান্তির প্রকৃত নাম রঙ্গাক্ষর রঙ্কি। তিনি খ্রিষ্টীয় ৭ম শতকের প্রথম দিক থেকে জীবিত ছিলেন। তিনি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের গুরু ছিলেন।তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ২টি (১৫ ও ২৬ নং)।তিনি বিহারের বিক্রমশীলায় বাস করতেন এবং বিক্রমশীলা বিহারের পণ্ডিত ছিলেন। তিনি প্রাচীন মৈথিলী ভাষা ব্যবহার করে পদ রচনা করেন।
লাড়িডোম্বীপাচর্য্যাপদ গীতিকায় তাঁর কোনো পদ পাওয়া যায় না, তাই তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না।কোনো পদ পাওয়া যায়নি।

চর্যাপদের ভাষা

চর্য্যাপদের ভাষা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের গবেষকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে:

  • বিজয়চন্দ্র মজুমদার (১৯২০ সালে):
    • তিনি চর্য্যাপদের ভাষা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।
    • তাঁর মতে, এটি ছয়টি ভাষার মিশ্রণঝাড়খণ্ডী ভাষায় রচিত।
    • তিনি এই ছয়টি ভাষা চিহ্নিত করেন: বাংলা, অসমিয়া, উড়িয়া, হিন্দি, মৈথিলী
  • ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২৬ সালে):
    • তিনি তাঁর “ODBL” (Origin and Development of the Bengali Language) গ্রন্থে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে সর্বপ্রথম চর্য্যাপদের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেন।
    • তিনি চর্য্যাপদকে বাংলা ভাষা বলে প্রমাণ করেন।


বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ইতিহাস বা আদি যুগ (৬৫০-১২০০ খ্রি)

সমাধানে যদি কোনো ভুল খুঁজে পান, তবে দয়া করে আমাদের জানিয়ে সাহায্য করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top