বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ইতিহাস বা আদি যুগ (৬৫০-১২০০ খ্রি)
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ইতিহাস (৬৫০-১২০০ খ্রি.) একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই সময়ে সাহিত্য শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ফুটিয়ে তোলে না, বরং ধর্ম, সমাজ ও ভাষার সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল। প্রাচীন যুগের ইতিহাস টপিকটি পাঠ করলে তোমরা শিখতে পারবে চর্য্যাপদের আবিষ্কার, লুইপা, কাহ্নপা ও ভুসুকুপার মতো কবিদের পরিচয়, তাদের রচনাকাল এবং ভাষাতত্ত্বের সূক্ষ্ম দিকগুলো। এই পোস্টে আমরা সেই প্রাচীন যুগের ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছি এবং তোমাদের জন্য ফ্রি PDF আকারে বিস্তারিত নোটও তৈরি করেছি। তাহলে চলো, শুরু করি।
Table of Contents
প্রাচীন যুগের ইতিহাস বা আদি যুগ (৬৫০-১২০০ খ্রি)
চর্যাপদের আবিষ্কার, আবিষ্কারক ও প্রকাশ
বিষয়
সময়কাল ও তথ্য
প্রথম ধারণা প্রকাশ
১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র তাঁর “Sanskrit Buddhist Literature in Nepal” গ্রন্থে প্রথম বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের ধারণা প্রকাশ করেন।
চর্য্যাপদ আবিষ্কার
১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) নেপালের রাজদরবারের রয়্যাল লাইব্রেরি থেকে চর্যাপদের সঙ্গে সরহপাদের দোহা, কাহ্নপাদের দোহা ও ডাকাবর্ন নামে আরও তিনটি পুথি আবিষ্কার করেন।
প্রকাশকাল
১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা” নামে এটি প্রকাশিত হয়।
চর্যাপদের রচনাকাল
বিশেষজ্ঞের মতে
চর্য্যাপদের রচনাকাল
চর্য্যাপদের বয়স (প্রায়)
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
৬৫০-১২০০ খ্রি.
১৩৬৬ বছর
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
৯৫০-১২০০ খ্রি.
১০৬৬ বছর
ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী ও ড. দীনেশচন্দ্র সেনের মতে
খ্রিষ্টীয় দশম-দ্বাদশ শতক
–
সুকুমার সেনের মতে
দশম হতে মধ্য-চতুর্দশ শতাব্দী
–
সর্বসম্মতিক্রমে
দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে
–
চর্যাপদের কবি পরিচিতি
চর্য্যাপদে কবির সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, ড. সুকুমার সেনের “বাঙালা সাহিত্যের ইতিহাস” (১ম খণ্ড) অনুযায়ী ২৩ জন কবির নাম পাওয়া যায়। তবে মতান্তরে কবির সংখ্যা ২৪ জন।
৩, ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৫, ১৮, ১৯, ২৪ (পাওয়া যায় নি), ৩৬, ৪০, ৪২, ৪৪ নং
ভুসুকুপা
৮টি
৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ নং
সরহপা
৪টি
২২, ৩২, ৩৮, ৩৯ নং
কুত্ত্বরীপা
২টি
২, ২০, ৪৮নং
শান্তি পা
২টি
১৫ ও ২৬নং
শবরপা
২টি
২৮ ও ৫০নং
লুইপা
২টি
১ ও ২৯নং
আর্যদেব পা
১টি
৩১নং
কঙ্কণপা
১টি
৪৪নং
কম্বলাম্বরপা
১টি
৮নং
গুন্ডরীপা
১টি
৪নং
চাটিল্পা
১টি
৩৩নং
চেঙ্গপা
১টি
৩৯নং
ডোম্বীপা
১টি
১৪নং
তাড়কপা
১টি
৩৭নং
দারিকপা
১টি
১৭নং
বীণাপা
১টি
১৭নং
মহীধরপা
১টি
১৫নং
ভাদেপা
১টি
৩৫নং
জয়ানন্দীপা
১টি
৪৬নং
ধর্মপা
১টি
১৭নং (এটি পাওয়া যায় নি)
লাড়িডোম্বীপা
১টি
(কোন পদ পাওয়া যায় নি)
তন্ত্রীপা
১টি
৩৯নং
কয়েকজন কবির পরিচয়
কবির নাম
পরিচিতি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
লুইপা
আদি চর্যাকার: চর্য্যাপদের আদি চর্যাকার মনে করা হয়। তিনি ১ নং ও ২৯ নং পদের রচয়িতা। পরিচিতি: হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের লোক। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, লুইপা ছিলেন শবরপার শিষ্য (৬৫০-৬৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে)। অন্যান্য গ্রন্থ: “অভি সময়বিভঙ্গ”, “বজ্রপাত”, “সাধন”, “বুদ্ধোদয়”, “ভগবদভিসার” ও “তত্ত্ব স্বভাব”।
শবরপা
সময়কাল: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, তাঁর জীবনকাল ৬৫০ থেকে ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। প্রাচীন কবি: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আরও মনে করেন শবরপা কবিদের মধ্যে প্রাচীন কবি। গুরু/শিষ্য: তিনি লুইপার গুরু এবং নাগার্জুনের শিষ্য ছিলেন। রচিত পদ: তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ২টি (২৮ ও ৫০ নং পদ)। অন্যান্য তথ্য: তিনি বীরুপাকে কম্বলাম্বরীকে “ডাকিনী-বজ্র-গীথি” ও “মহামুদ্রোপদেশ” নামক দুটি গ্রন্থ লিখতে সাহায্য করেছিলেন।
কাহ্নপা (Krishnacharya)
বিভাগ
তথ্য
সময়কাল
খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের কবি বলে ধারণা করা হয়।
আসল নাম
তাঁর আসল নাম কৃষ্ণচার্য।
গুরুত্ব
চর্য্যাপদের প্রধান কবি হিসেবে বিবেচিত। চর্য্যাপদের কবিদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ।
আবাসস্থল
ঐতিহাসিকরা তাঁকে উড়িষ্যার অধিবাসী মনে করলেও, বাংলা সাহিত্যের গবেষক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য তাঁকে নেত্রকোণার অধিবাসী বলে প্রমাণ করেছেন।
স্থান
পরিণত বয়সে তিনি সোমপুর বিহারের বিখ্যাত আচার্য ছিলেন।
রাজত্বকাল
রাজা ধর্মপাল ও রাজা দেবপালের রাজত্বকালে তিনি বর্তমান ছিলেন।
রচিত পদ
১৩টি পদ উদ্ধার হয়েছে (তার মধ্যে ২৪ নং পদটি পাওয়া যায় নি)। পদগুলো হলো: ৩, ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৫, ১৮, ১৯, ৩৬, ৪০, ৪২ নং।
ভাষা
তাঁর পদে অপভ্রংশ ভাষার একটি দোষ আছে এবং এটি ৩৬টি চর্য্যাগান সংকলনে সংরক্ষিত হয়েছে।
গুরু
তাঁর গুরু ছিলেন জালন্ধরীপা। তাঁর অন্য নাম ছিল হাডিপা।
উপাধি
সম্প্রদায়গতভাবে ব্রাহ্মণ হলেও সহজিয়া মতের দীক্ষা নিয়ে সিদ্ধাচার্য ও মহাচার্য উপাধিতে ভূষিত হন।
তিব্বতের কাছাকাছি কোনো অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
পরিচিতি
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, তিনি বাংলাদেশেরই অধিবাসী। সুকুমার সেন মনে করেন, কুত্ত্বরীপার ভাষায় নারীদেহের ভাষার মিল আছে, তাই তিনি নারী কবিও হতে পারেন।
রচিত পদ
২টি পদ (২ নং ও ২০ নং পদ)। ৪৮ নং পদটি পাওয়া যায় নি।
ভাষার বৈশিষ্ট্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর পদগুলো তুলনামূলকভাবে গ্রাম্য ও ইতর ভাষার।
আর্যদেবপা (Āryadeva)
বিভাগ
তথ্য
সময়কাল
খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের প্রথমার্ধের কবি ছিলেন।
আসল নাম
তাঁর প্রকৃত নাম ছিল আজদেব।
জন্মস্থান
তিনি সিংহলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলতঃ মেবারের রাজা ছিলেন।
অন্যান্য তথ্য
তিনি কম্বলাম্বরপার সমসাময়িক ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। পরে গোরক্ষনাথের কাছে বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা লাভ করে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
রচিত পদ
চর্যার ৩১ নং পদের রচয়িতা।
ভাষা
তাঁর রচিত পদের ভাষা বাংলা ও উড়িয়া মিশ্রিত।
কঙ্কণপা (Kankaṇapā)
বিভাগ
তথ্য
সময়কাল
খ্রিষ্টীয় নবম শতকের শেষভাগের কবি বলে ধারণা করা হয়।
পূর্ব জীবন
প্রথম জীবনে তিনি বিষ্ণুপুরের রাজা ছিলেন।
গুরু
পরবর্তীকালে তাঁর গুরু কম্বলাম্বরপার কাছ থেকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে সিদ্ধ হন।
রচিত পদ
চর্যার ৪৪ নং বৌদ্ধ গানটি রচনা করেন।
ভাষা
তাঁর পদের ভাষা ছিল বাংলা ও অপভ্রংশ মিশ্রিত।
কম্বলাম্বরপা (Kambalāmbara)
বিভাগ
তথ্য
সময়কাল
আনুমানিক ৭৫০ থেকে ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে।
আবাসস্থল
অনেকে মনে করেন তিনি উড়িষ্যা কিংবা পূর্ব ভারতবাসী ছিলেন।
পরিচিতি
তিনি কম্বলারামের রাজপুত্র এবং দেবপালের রাজত্বকালে বর্তমান ছিলেন। চর্যায় তিনি ভিক্ষু ও সিদ্ধা হিসেবে পরিচিত।
গুরুত্ব
তিনি প্রাচীন বাংলায় বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেন।
রচিত পদ
চর্যার ৮ নং বৌদ্ধ গানটি তাঁর রচিত।
অন্যান্য তথ্য
ধারণা করা হয় তিনি জালন্ধরীপার গুরু ছিলেন।
জয়ানন্দীপা (Jayanandi)
বিভাগ
তথ্য
সময়কাল
সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।
আবাসস্থল
জানা যায় তিনি বাংলাদেশের কোনো এক নাগসবায় মণ্ডলী ছিলেন।
আসল নাম
তাঁর আসল নাম জয়ানন্দ। তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন।
রচিত পদ
চর্যার ৪৬ নং পদটি তিনি রচনা করেন।
ভাষা
তাঁর ভাষা ছিল গৌড় অপভ্রংশের পরবর্তী আধুনিক আর্যভাষার প্রাচীন রূপ, যা ছিল মৈথিলী, উড়িয়া, বাংলা ও আসামি বাংলার সংমিশ্রণ।
চেঙ্গপা (Ceṅgapā)
বিভাগ
তথ্য
সময়কাল
খ্রিষ্টীয় নবম শতকে তিনি বর্তমান ছিলেন। অর্থাৎ তিনি দেবপাল-বিগ্রহপালের সমকালে বর্তমান ছিলেন।
আসল নাম
তাঁর আসল নাম চেঙ্গস।
জন্মস্থান
অরঙ্গনগরের উজ্জনীয়ীতে জন্মগ্রহণ করেন।
রচিত পদ
তিনি চর্যার ৩৩ নং পদটি রচনা করেন।
পদের বিষয়বস্তু
তাঁর পদে বেদেদের দুঃখের কথা, খাটের কথা, মাদল বাজিয়ে বিয়ে উৎসবে পালন, নববধূ নাক-কানের দুল পরার কথা, সর্বোপরি বাঙালি জীবনের দারিদ্র্যের চিত্র পাওয়া যায়।
ডোম্বীপা (Ḍombīpā)
বিভাগ
তথ্য
সময়কাল
তাঁর জীবনকাল মোটামুটি ৯৫০-৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বলে মনে করা হয়।
পরিচিতি
ধারণা করা হয় ডোম্বীপা ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তিনি ছিলেন হেরুক ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা।
ধর্মান্তর
বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হয়ে যখন দেশ ছেড়ে বনে জঙ্গলে ঘুরতে শুরু করেন তখন তাঁর নাম হয় ডোম্বীপা।
গুরু ও সঙ্গী
বিরূপা ছিলেন তাঁর গুরু। তাঁর সঙ্গী ছিল ডুমনি নামক এক ডোম জাতীয় পত্নী।
রচিত পদ
চর্যার ১৪ নং গানটি রচিত।
অন্যান্য তথ্য
তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করায় প্রজারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এরপর দেশে দুর্ভিক্ষ ও মহামারী শুরু হয়। তিনি দেশে ফিরে এসে রাজাকে বর্মদান করতে অনুরোধ করেন এবং বৌদ্ধধর্মের দীক্ষালাভ করান।
গুন্ডরীপা (Guṇḍarīpā)
বিভাগ
তথ্য
আবাসস্থল
তিনি বাংলা বা বিহারের লোক ছিলেন বলে মতভেদ আছে।
রাজত্বকাল
রাজা দেবপালের রাজত্বকালে (৮০৯-৮৪২ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি বর্তমান ছিলেন বলে মনে করা হয়।
তিনি ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে দক্ষিণ ভারতে জীবিত ছিলেন বলে মনে করা হয়।
রচিত পদ
চর্যার ৩৩ নং পদটি তাঁর রচিত।
পদের বৈশিষ্ট্য
তাঁর পদে সরল জনসূলভ বক্তব্য ও নীতিমূলক অঞ্চলের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।
আরো কবিদের পরিচয়
কবির নাম
সময়কাল ও পরিচিতি
রচিত পদ
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সরহপা
দশম ও একাদশ শতকের কবি। জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু পরে ভিক্ষু ও সিদ্ধ হন। তিনি অলোকিক ক্ষমতার কবি।
৪টি পদ। ৪৯ নং পদে নৌকা ও এপার-ওপার যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে।
পূর্ববঙ্গের রাজাদের দেশে (উদয়বন্দ), কামরূপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পদাবলীর ভাষা ছিল বজ্রগীতি। কামরূপের রাজা ইন্দ্রভূতি ছিলেন তাঁর শিষ্য।
ভুসুকুপা
পূর্ব বাংলার কবি। আসল নাম শান্তিদেব। অষ্টম থেকে একাদশ শতকের সৌরাষ্ট্রের রাজা কল্যাণবর্মার পুত্র ছিলেন।
৮টি পদ (৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ নং)। চর্যাপদের রচনায় তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন।
নিজেকে বাঙালি বলে দাবি করেছেন। তিনি একজন রাজপুত্র ছিলেন, কিন্তু তাঁকে উপহাস করে ‘ভুসুকু’ নামে ডাকা হত। শেষ জীবনে নালন্দা বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে ছিলেন।
বিরূপা
অষ্টম শতকের কবি বলে ধারণা করা হয়। রাজা দেবপালের রাজ্যে ত্রিপুরায় জন্মগ্রহণ করেন।
চর্যাপদের তৃতীয় পদটি তাঁর রচিত।
তিনি জালন্ধরীপার শিষ্য। অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। মদ্যমাংস ভোজনের অপরাধে বিহার থেকে বিতাড়িত হন। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, তিনি ভিক্ষুরূপে সোমপুর বিহারে বাস করতেন।
বীণাপা
খ্রিষ্টীয় নবম শতকের লোক। ডোম্বীপার সমসাময়িক। গাঙুর-গৌড় অঞ্চলে এক ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
চর্যার ১৭ নং পদটি রচনা করেন।
বীণা তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র হওয়ায় তাঁর নাম বীণাপা। তাঁর চর্যাপদের ভাষা ছিল বাংলা। তিনি প্রাচীন বাংলায় গীত রচনার পাশাপাশি বজ্রডাকিনীপক্রিম নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
ভাদেপা
খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান মণিপুর।
চর্যার ৩২ নং বৌদ্ধ গানটি তিনি রচনা করেন।
ভিক্ষু পাল ও নারায়ণ পালের সময় বর্তমান ছিলেন। তিনি চর্যার সুপ্রসিদ্ধ নামে পরিচিত। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা লাভের পর সিদ্ধ হন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতে, তিনি কাহ্নপার শিষ্য।
তন্ত্রীপা
সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। রাহুল সাংকৃত্যায়ন-এর মতে, তাঁর আসল নাম নাড়ুপাদ।
চর্যার ১৭ নং পদটি রচনা করেন।
–
দারিকপা
খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের শেষভাগ ও নবম শতকের শুরুতে জীবিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃত নাম ইন্দ্রপাল। উড়িষ্যার সালিপুত্রে জন্মগ্রহণ করেন।
চর্যার ৩৪ নং বৌদ্ধ গানটি রচনা করেন। পদটি প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত।
তিনি লুইপার সাক্ষাৎ শিষ্য নন, শিষ্য পরম্পরার একজন। তাঁর রচিত দুটি গ্রন্থ: তত্ত্বাধিকার ও সপ্তম সিদ্ধান্ত।
ধর্মপা
খ্রিষ্টীয় নবম শতকের শুরুর দিকে তাঁর জন্ম। তিনি প্রায় ৮৭৫ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তিনি বিক্রমপুরের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
চর্যার ৪৭ নং পদটি রচনা করেন।
তিনি বজ্রব্জা, রূপা, ও নারায়ণ পালের সময় জীবিত ছিলেন। তিনি চর্যার সর্বশেষ কবি এবং চেঙ্গপার সমসাময়িক ছিলেন। তিনি কাহ্নপার শিষ্য।
মহীধরপা
খ্রিষ্টীয় নবম শতকে পাল রাজা বিগ্রহ পাল ও নারায়ণ পালের রাজত্বকালে বর্তমান ছিলেন।
চর্যার ১৬ নং পদটি রচনা করেন।
তিনি ত্রিপুরার অধিবাসী ছিলেন (যা সে সময় ত্রিপুরা মগধ অঞ্চলের মধ্যে ছিল)। তিনি কাহ্নপার শিষ্য এবং কাহ্নপার সাথে চট্টগ্রামে ভ্রমণ করেন। তিনি প্রাচীন মৈথিলী ভাষা ব্যবহার করেছেন।
শান্তি পা
শান্তির প্রকৃত নাম রঙ্গাক্ষর রঙ্কি। তিনি খ্রিষ্টীয় ৭ম শতকের প্রথম দিক থেকে জীবিত ছিলেন। তিনি অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের গুরু ছিলেন।
তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ২টি (১৫ ও ২৬ নং)।
তিনি বিহারের বিক্রমশীলায় বাস করতেন এবং বিক্রমশীলা বিহারের পণ্ডিত ছিলেন। তিনি প্রাচীন মৈথিলী ভাষা ব্যবহার করে পদ রচনা করেন।
লাড়িডোম্বীপা
চর্য্যাপদ গীতিকায় তাঁর কোনো পদ পাওয়া যায় না, তাই তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না।
কোনো পদ পাওয়া যায়নি।
–
চর্যাপদের ভাষা
চর্য্যাপদের ভাষা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের গবেষকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে:
বিজয়চন্দ্র মজুমদার (১৯২০ সালে):
তিনি চর্য্যাপদের ভাষা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।
তাঁর মতে, এটি ছয়টি ভাষার মিশ্রণ – ঝাড়খণ্ডী ভাষায় রচিত।
তিনি এই ছয়টি ভাষা চিহ্নিত করেন: বাংলা, অসমিয়া, উড়িয়া, হিন্দি, মৈথিলী।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২৬ সালে):
তিনি তাঁর “ODBL” (Origin and Development of the Bengali Language) গ্রন্থে বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে সর্বপ্রথম চর্য্যাপদের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেন।
তিনি চর্য্যাপদকে বাংলা ভাষা বলে প্রমাণ করেন।
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের ইতিহাস বা আদি যুগ (৬৫০-১২০০ খ্রি)