HSC বাংলা বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতার স্মার্ট নোট

HSC বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতার স্মার্ট নোট (PDF)-এ রয়েছে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা, লাইনভিত্তিক বিশ্লেষণ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, পরীক্ষায় আসার মতো তথ্য ও দ্রুত প্রস্তুতির জন্য পূর্ণাঙ্গ স্টাডি নোট।


বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতার স্মার্ট নোট

📌 মৌলিক তথ্য

  • জন্ম: ২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪, সাগরদাঁড়ি গ্রাম, যশোর (বর্তমান বাংলাদেশ)
  • মৃত্যু: ২৯ জুন, ১৮৭৩, কলকাতা (বয়স ৪৯)
  • পরিচয়: উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার
  • উপাধি: বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব

🎭 ব্যক্তিগত জীবন

দিকবিবরণ
পারিবারিকসম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবার, পিতা রাজনারায়ণ দত্ত (আইনজীবী), মাতা জাহ্নবী দেবী
ধর্মান্তর১৮৪৩ সালে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ; নাম হয় “মাইকেল মধুসূদন দত্ত”
শিক্ষাহিন্দু কলেজ → বিশপস কলেজ (গ্রিক, লাতিন, সংস্কৃত)
বৈবাহিক জীবন১ম: রেবেকা ম্যাকটিভিস (ইংরেজ); ২য়: এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া (ফরাসি)

✍️ সাহিত্যিক অবদান

🔹 নতুন রীতি প্রবর্তন

  • অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক (বাংলা সাহিত্যে প্রথম)
  • চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট)-এর প্রবর্তক

🔹 ভাষাগত দক্ষতা

১২টি ভাষায় পারদর্শী: বাংলা, ইংরেজি, ল্যাটিন, গ্রিক, ফারসি, হিব্রু, তেলুগু, তামিল, ইতালীয় ইত্যাদি

📚 প্রধান সাহিত্যকর্ম

🎭 নাটক

শিরোনামসালধরণ
শর্মিষ্ঠা১৮৫৯পৌরাণিক নাটক (প্রথম আধুনিক বাংলা নাটক)
পদ্মাবতী১৮৬০ট্র্যাজি-কমেডি
কৃষ্ণকুমারী১৮৬১নাটক
একেই কি বলে সভ্যতা?১৮৬০প্রহসন
বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ১৮৬০প্রহসন

📖 কাব্য

শিরোনামসালবৈশিষ্ট্য
মেঘনাদবধ কাব্য১৮৬১শ্রেষ্ঠ কীর্তি, অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণ উপাখ্যান-ভিত্তিক মহাকাব্য
তিলোত্তমাসম্ভব১৮৬০আখ্যান কাব্য
ব্রজাঙ্গনা১৮৬১গীতিকাব্য
বীরাঙ্গনা১৮৬২পত্রকাব্য (প্রথম)
চতুর্দশপদী কবিতাবলী১৮৬৬সনেট সংকলন

ইংরেজি রচনা

  • The Captive Lady (১৮৪৯) — প্রথম কাব্যগ্রন্থ
  • The Apsara: A Story from Hindu Mythology
  • Visions of the Past

💡 উল্লেখযোগ্য বিষয়

প্রভাব ও অনুপ্রেরণা

  • ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন-এর সাহিত্য দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত
  • হোমেরিক স্টাইলের প্রবর্তন (বাংলা কাব্যে)
  • অধ্যক্ষ ডি. এল. রিচার্ডসন কাব্যপ্রীতি সঞ্চার করেছিলেন

📌 অমর বাণী

“আমি এক সকালে উঠে নিজেকে সফল হিসেবে পাই নি, এই কাব্যের সফলতা বহু বছরের কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।” (মেঘনাদবধ কাব্য প্রসঙ্গে)

বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতার ব্যাখ্যা

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর ষষ্ঠ সর্গ থেকে সংকলিত ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কবিতাটির প্রতিটি লাইনের সহজ ও প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:

পর্ব ১: মেঘনাদের বিস্ময় ও বিভীষণকে ধিক্কার

“এতক্ষণে”- অরিন্দম কহিলা বিষাদে-

ব্যাখ্যা: অরি বা শত্রুকে দমন করেন যিনি, সেই মেঘনাদ বিষাদ বা দুঃখের সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এতক্ষণে বিষয়টি বুঝতে পারলেন।

“জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল / রক্ষঃপুরে!

ব্যাখ্যা: মেঘনাদ বুঝতে পারলেন, কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত রাক্ষসদের নগরীতে (নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে) কীভাবে অনাহূত লক্ষ্মণ প্রবেশ করতে পেরেছিল।

হায়, তাত, উচিত কি তব / এ কাজ,

ব্যাখ্যা: আক্ষেপ করে মেঘনাদ কাকা বিভীষণকে বললেন— হে কাকা, আপনার কি এই স্বজাতিদ্রোহী কাজ করা উচিত হয়েছে?

নিকষা সতী তোমার জননী, / সহোদর রক্ষঃশ্রেষ্ঠ?

ব্যাখ্যা: মেঘনাদ কাকাকে তাঁর বংশমর্যাদা মনে করিয়ে দিচ্ছেন— সতী নিকষা আপনার মা, আর বীরশ্রেষ্ঠ রাক্ষসরাজ রাবণ আপনার আপন ভাই!

শূলিশম্ভুনিভ / কুম্ভকর্ণ?

ব্যাখ্যা: মহাদেবের মতো পরাক্রমশালী ও শক্তিশালী কুম্ভকর্ণ আপনার সহোদর ভাই!

ভ্রাতৃপুত্র বাসববিজয়ী!

ব্যাখ্যা: আর আপনার ভাতিজা আমি নিজে, যে দেবরাজ ইন্দ্রকেও যুদ্ধে পরাজিত করে ‘বাসব বিজয়ী’ উপাধি পেয়েছি!

নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে? / চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে?

ব্যাখ্যা: হে কাকা, আপনি নিজের বাড়ির গোপন পথ চোরকে (লক্ষ্মণকে) দেখিয়ে দিলেন? নীচ চণ্ডালতুল্য শত্রুকে এনে রাজপ্রাসাদে বসাচ্ছেন?

কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরু জন তুমি / পিতৃতুল্য।

ব্যাখ্যা: কিন্তু আমি আপনাকে কোনো তিরস্কার বা ভর্ৎসনা করছি না, কারণ আপনি আমার বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বাবার মতো শ্রদ্ধেয়।

ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে, / পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে, / লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে।”

ব্যাখ্যা: আপনি দরজার পথ ছেড়ে দিন, আমি অস্ত্রাগারে গিয়ে অস্ত্র নিয়ে আসি। রামের অনুজ (ছোট ভাই) লক্ষ্মণকে যমালয়ে (মৃত্যুপুরীতে) পাঠাব এবং যুদ্ধের মাধ্যমে লঙ্কার কপালে লাগা এই কলঙ্ক আজ মুছে দেব।

পর্ব ২: বিভীষণের যুক্তি ও আত্মসমর্পণ

উত্তরিলা বিভীষণ, “বৃথা এ সাধনা, / ধীমান্!

ব্যাখ্যা: বুদ্ধিমান মেঘনাদের কথার জবাবে বিভীষণ বললেন— হে বুদ্ধিমান, তোমার এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও বৃথা।

রাঘবদাস আমি; কী প্রকারে / তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে / অনুরোধ?”

ব্যাখ্যা: আমি রঘু বংশের সন্তান রামের দাস; সুতরাং তোমার অনুরোধ রাখতে গিয়ে আমি কীভাবে রামের প্রতিকূলে বা বিরুদ্ধে কাজ করব?

পর্ব ৩: মেঘনাদের ক্ষোভ ও উপমা প্রয়োগ

উত্তরিলা কাতরে রাবণি;- / “হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে!

ব্যাখ্যা: রাবণ-পুত্র মেঘনাদ অত্যন্ত কষ্ট পেয়ে উত্তর দিলেন— হে কাকা, আপনার মুখে এমন কথা শুনে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে!

রাঘবের দাস তুমি? কেমনে ও মুখে / আনিলে এ কথা, তাত, কহ তা দাসেরে !

ব্যাখ্যা: আপনি রামের দাস? হে কাকা, এই অপমানের কথা আপনার মুখে আনলেন কীভাবে? আপনার এই ভাতিজাকে দয়া করে তা বলুন!

স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে; / পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি / ধূলায়?

ব্যাখ্যা: সৃষ্টিকর্তা চাঁদকে মহাদেবের কপালে স্থান দিয়েছেন; সেই চাঁদ কি কখনো আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে ধুলোয় গড়াগড়ি খায়? (অর্থাৎ, আভিজাত্য ছেড়ে নীচতা গ্রহণ করা সাজে না)।

হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে / কে তুমি? জনম তব কোন মহাকুলে?

ব্যাখ্যা: হে রাক্ষস বীর, আপনি কীভাবে ভুলে গেলেন যে আপনি কে এবং কত উচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ বংশে আপনার জন্ম হয়েছে?

কে বা সে অধম রাম?

ব্যাখ্যা: আর সেই তুচ্ছ, অধম রামই বা কে যে তার দাসত্ব করতে হবে?

স্বচ্ছ সরোবরে / করে কেলি রাজহংস পঙ্কজ-কাননে; / যায় কি সে কভু, প্ৰভু, পঙ্কিল সলিলে, / শৈবালদলের ধাম?

ব্যাখ্যা: রাজহাঁস তো পদ্মফুলে ভরা তাজা স্বচ্ছ সরোবরে খেলা করে; সে কি কখনো শেওলা ও কাদা ভরা নোংরা পানিতে খেলা করতে যায়?

মৃগেন্দ্র কেশরী, / কবে, হে বীরকেশরী, সম্ভাষে শৃগালে / মিত্রভাবে?

ব্যাখ্যা: পশুর রাজা সিংহ কি কখনো শেয়ালকে বন্ধু হিসেবে সম্ভাষণ বা গ্রহণ করে? (রাম-লক্ষ্মণকে শেয়াল এবং বিভীষণকে সিংহের সাথে তুলনা করা হয়েছে)।

অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি, / অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে ।

ব্যাখ্যা: আমি আপনার কাছে অজ্ঞ বা মূর্খমাত্র, কিন্তু আপনি তো সবচেয়ে জ্ঞানী; আপনার কাছে তো কোনো কিছুই অজানা নয়।

ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষ্মণ; নহিলে / অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে?

ব্যাখ্যা: লক্ষ্মণ একজন নীচ ও সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষ; তা না হলে কি সে একজন অস্ত্রহীন যোদ্ধাকে (পূজারত মেঘনাদকে) যুদ্ধের জন্য আহ্বান করত?

কহ, মহারথী, এ কি মহারথীপ্রথা ? / নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে / এ কথা!

ব্যাখ্যা: বলুন কাকা, অস্ত্রহীন মানুষের ওপর আক্রমণ করা কি বীরদের প্রথা? লঙ্কাপুীর ছোট শিশুও যদি এই কাপুরুষতার কথা শোনে, তবে সে-ও হেসে উঠবে!

ছাড়হ পথ; আসিব ফিরিয়া / এখনি! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে, / বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি!

ব্যাখ্যা: আপনি পথ ছেড়ে দিন, আমি এখনই অস্ত্র নিয়ে ফিরে আসছি! আজ দেখব কোন দেবতার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সুমাত্রার দুর্মতি পুত্র লক্ষ্মণ (সৌমিত্রি) আমাকে যুদ্ধে পরাস্ত করতে পারে!

দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ, / রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের!

ব্যাখ্যা: দেবতা, দানব ও মানুষের সাথে যুদ্ধে আমার বীরত্ব ও শক্তি তো আপনি স্বচক্ষে দেখেছেন!

কী দেখি / ডরিবে এ দাস হেন দুর্বল মানবে?

ব্যাখ্যা: তা দেখেও কেন ভাবছেন যে আপনার এই ভাতিজা লক্ষ্মণের মতো দুর্বল মানুষকে দেখে ভয় পাবে?

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রগলভে পশিল / দম্ভী; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে ।

ব্যাখ্যা: ধৃষ্ট লক্ষ্মণ অতর্কিতে অত্যন্ত অহংকারের সাথে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করেছে; আমাকে শুধু অনুমতি দিন, আমি এই নরাধমকে উপযুক্ত শাস্তি দেব।

তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে / বনবাসী!

ব্যাখ্যা: হে কাকা, আপনার পবিত্র জন্মভূমিতে আজ এক সাধারণ বনবাসী (লক্ষ্মণ) এসে পা রেখেছে!

হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে / ভ্রমে দুরাচার দৈত্য? প্ৰফুল্ল কমলে / কীটবাস?

ব্যাখ্যা: হে ঈশ্বর, স্বর্গের নন্দনকাননে কি পাপী দৈত্য বিচরণ করতে পারে? বিকশিত সুন্দর পদ্মফুলে কি বিষাক্ত পোকা বাস করতে পারে?

কহ তাত, সহিব কেমনে / হেন অপমান আমি,— ভ্রাতৃ-পুত্র তব? / তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে?”

ব্যাখ্যা: বলুন কাকা, আপনার আপন ভাতিজা হয়ে আমি এই অপমান কীভাবে সহ্য করব? আর আপনি নিজে রাক্ষস বংশের রত্ন হয়ে এই অপমান সহ্য করছেন কীভাবে?

পর্ব ৪: আত্মপক্ষ সমর্থনে বিভীষণের যুক্তি

মহামন্ত্র-বলে যথা নম্রশিরঃ ফণী, / মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী / রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে;

ব্যাখ্যা: সাপুড়ের গুণমন্ত্রে সাপ যেমন মাথা নত করে ফেলে, ঠিক তেমনি রাবণ-পুত্র মেঘনাদের যুক্তির কাছে লজ্জিত ও বিষণ্ণ মুখে মাথা নিচু করে রাবণের ছোট ভাই বিভীষণ উত্তর দিলেন।

“নহি দোষী আমি, বৎস; বৃথা ভর্ৎস মোরে / তুমি!

ব্যাখ্যা: হে বাছা (মেঘনাদ), এতে আমার কোনো দোষ নেই; তুমি আমাকে অকারণেই তিরস্কার ও গালমন্দ করছ!

নিজ কর্ম-দোষে, হায়, মজাইলা / এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি!

ব্যাখ্যা: রাজা রাবণ তাঁর নিজের অন্যায় কর্মের (সীতা হরণের) ফলে এই সোনার লঙ্কাপুরীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন এবং নিজেও ধ্বংসের দিকে যাচ্ছেন।

বিরত সতত পাপে দেবকুল; এবে / পাপপূর্ণ লঙ্কাপুরী;

ব্যাখ্যা: দেবতারা সবসময় পাপকাজ থেকে দূরে থাকেন; কিন্তু বর্তমানে লঙ্কাপুরী পাপে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে।

প্রলয়ে যেমতি / বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কালসলিলে !

ব্যাখ্যা: প্রলয়ের সময়ে পৃথিবী যেমন পানির নিচে তলিয়ে যায়, ঠিক তেমনি পাপের সাগরে আজ লঙ্কাপুরী ধ্বংসের জলে ডুবে যাচ্ছে।

রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী / তেঁই আমি । পরদোষে কে চাহে মজিতে?”

ব্যাখ্যা: আত্মরক্ষার তাগিদেই আমি আজ ধর্মাত্মা রামের পায়ে আশ্রয় নিয়েছি। অন্যের করা পাপের শাস্তি কে নিজের কাঁধে নিতে চায়?

পর্ব ৫: স্বজাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত জবাব

রুষিলা বাসবত্রাস। গম্ভীরে যেমতি / নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্ৰ কোপি, / কহিলা বীরেন্দ্র বলী,

ব্যাখ্যা: দেবরাজ ইন্দ্রের তটস্থকারী মেঘনাদ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। গভীর রাতে আকাশে মেঘের গর্জন যেমন গম্ভীর শোনায়, বীর মেঘনাদ তেমনি গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠে বললেন—

“ধর্মপথগামী, / হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে / তুমি; –

ব্যাখ্যা: হে ধর্মপরায়ণ রাক্ষসরাজের ছোট ভাই (বিভীষণ), আপনি তো ধর্মানুরাগী হিসেবে জগতে বিখ্যাত;

কোন্ ধর্ম মতে, কহ দাসে, শুনি, / জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,—এ সকলে দিলা / জলাঞ্জলি?

ব্যাখ্যা: কিন্তু আমাকে দয়া করে বলুন, কোন ধর্মের নিয়মে আপনি নিজের রক্তসম্পর্ক, ভাইয়ের ভালোবাসা এবং নিজের জাতি ও দেশকে এক নিমেষে বিসর্জন দিলেন?

শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি / পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি / নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা!

ব্যাখ্যা: শাস্ত্রে সুস্পষ্ট বলা আছে— শত্রু বা পরপুরুষ যদি বহুগুণে গুণবানও হয় এবং নিজের স্বজন যদি গুণহীনও হয়, তবুও সেই গুণহীন স্বজনই আপন ও শ্রেয়। কারণ পর তো সবসময় পরই থাকে!

এ শিক্ষা, হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে?

ব্যাখ্যা: হে রাক্ষসশ্রেষ্ঠ, দেশকে ও স্বজাতিকে ত্যাগ করার এই অদ্ভুত শিক্ষা আপনি কোথায় পেলেন?

কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা! হেন সহবাসে, / হে পিতৃব্য, বর্বরতা কেন না শিখিবে ?

ব্যাখ্যা: কিন্তু আপনাকে ধিক্কার দেওয়া অনর্থক! কারণ, রাম-লক্ষ্মণের মতো হীন বনবাসীদের সাথে যার ওঠাবসা, হে কাকা, সে তো তাদের থেকে বর্বরতা ও নীচতাই শিখবে!

গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি।”

ব্যাখ্যা: যার সঙ্গ বা চলাফেরা নীচ চরিত্রের মানুষের সাথে হয়, তার চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিও শেষ পর্যন্ত নীচ ও নিকৃষ্ট হয়ে যায়।

বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

★ “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কবিতার রচয়িতা — মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

★ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম — ২৫ জানুয়ারি, ১৮২৪।

★ মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান — যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রাম।

★ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু — ২৯ জুন, ১৮৭৩।

★ মধুসূদন দত্তের পিতার নাম — রাজনারায়ণ দত্ত।

★ রাজনারায়ণ দত্তের পেশা — কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের খ্যাতনামা আইনজীবী।

★ মধুসূদন দত্তের মাতার নাম — জাহ্নবী দেবী।

★ মধুসূদন দত্তের শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় — মা জাহ্নবী দেবীর কাছে।

★ মধুসূদন দত্তকে রামায়ণ, মহাভারত ও হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর সাথে পরিচয় করান — মা জাহ্নবী দেবী।

★ শৈশবে মধুসূদন বাংলা, ফারসি ও আরবি শিক্ষা লাভ করেন — মুফতি লুৎফুল হকের কাছে।

★ মুফতি লুৎফুল হক ছিলেন — শেখপুরা মসজিদের বিদ্বান ইমাম।

★ মধুসূদন তেরো বছর বয়সে বাস করতে শুরু করেন — কলকাতায়।

★ কলকাতার সার্কুলার গার্ডেনরিচ রোডে অট্টালিকা নির্মাণ করেছিলেন — রাজনারায়ণ দত্ত।

★ মধুসূদন দত্ত যে কলেজে ভর্তি হন — হিন্দু কলেজ (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)।

★ হিন্দু কলেজে মধুসূদনের প্রিয় শিক্ষক ছিলেন — ডি. এল. রিচার্ডসন।

★ মধুসূদনের মধ্যে কাব্যপ্রীতি সঞ্চারিত করেছিলেন — অধ্যক্ষ ডি. এল. রিচার্ডসন।

★ মধুসূদনকে স্বদেশানুরাগের স্মৃতিতে উদ্বুদ্ধ করতেন — প্রফাত অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও।

★ হিন্দু কলেজে মধুসূদনের সহপাঠী ছিলেন — ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, প্যারীচরণ সরকার।

★ মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন — ১৮৪৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।

★ মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন — রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে (পাদরি ডিলট্রি দীক্ষা দেন)।

★ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার স্থান — মিশন রো-এর ওল্ড মিশন চার্চ।

★ ধর্মান্তরিত হওয়ার পর নাম হয় — মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

★ ধর্মান্তরিত হওয়ার পর পিতৃহীন ও ত্যাজ্যপুত্র হন — রাজনারায়ণ দত্ত কর্তৃক।

★ ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান — শিবপুরের বিশপস কলেজে।

★ বিশপস কলেজে মধুসূদন যেসকল ভাষা শেখেন — গ্রিক, লাতিন ও সংস্কৃত।

★ বিশপস কলেজের বন্ধুদের সাথে ভাগ্যান্বেষণে যান — মাদ্রাজ (অধুনা চেন্নাই)।

★ মাদ্রাজে মধুসূদনের জীবিকা ছিল — স্কুলে ইংরেজি শিক্ষকতা ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি।

★ মধুসূদন সম্পাদিত পত্রিকা — হিন্দু ক্রনিকল।

★ মধুসূদন দত্তের প্রথম ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ — দ্য ক্যাপটিভ লেডি (১৮৪৯)।

★ ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ কাব্যের রচয়িতা — মাইকেল মধুসূদন দত্ত (পঁচিশ বছর বয়সে রচিত)।

★ মধুসূদনের প্রথম স্ত্রী — রেবেকা ম্যাকটাভিশ (ইংরেজি যুবতী, বিয়ে: ৩১ জুলাই, ১৮৪৮)।

★ রেবেকার সাথে মধুসূদনের দাম্পত্য জীবন স্থায়ী হয় — ৮ বছর।

★ রেবেকার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান সংখ্যা — ২ পুত্র ও ২ কন্যা।

★ মধুসূদনের দ্বিতীয় স্ত্রী — এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া (ফরাসি তরুণী)।

★ হেনরিয়েটা ও মধুসূদনের সন্তানদের নাম — নেপোলিয়ান (পুত্র) ও শর্মিষ্ঠা (কন্যা)।

★ মধুসূদনের বংশধর টেনিস খেলোয়াড় — লিয়েন্ডার পেজ।

★ ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ পাঠ করে মধুসূদনকে দেশে ফিরে বাংলায় সাহিত্য রচনার পরামর্শ দেন — জে ই ডি বেথুন।

★ বেথুনের কাছে ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ পাঠিয়েছিলেন — গৌরদাস বসাক।

★ মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসেন — ১৮৫৬ সালে।

★ আইন পড়তে মধুসূদন ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে যান — ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে (১৮৬০ সালে)।

★ ইউরোপে অবস্থানকালে মধুসূদনকে আর্থিক সহায়তা করেন — ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

★ মাতৃভাষা ছাড়া মধুসূদন ভাষা জানতেন — ১২টি (বহুভাষাবিদ)।

★ বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের পদার্পণ ঘটে — নাট্যকার হিসেবে।

★ রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘রত্নাবলী’ নাটকের অনুবাদ করতে গিয়ে অভাব বোধ করেন — উপযুক্ত বাংলা নাটকের।

★ বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক ও পাশ্চাত্য শৈলীর নাটক — শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯)।

★ ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক প্রথম অভিনীয় হয় — ৩ সেপ্টেম্বর ১৮৫৯ (বেলগাছিয়া নাট্যশালায়)।

★ ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের পৃষ্ঠপোষক — পাইকপাড়ার জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ও প্রতাপচন্দ্র সিংহ।

★ ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের কাহিনী সংগৃহীত — মহাভারতের আদিপর্ব (যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানি) থেকে।

★ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক প্রহসন — একেই কি বলে সভ্যতা? ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০)।

★ ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ প্রহসনের বিষয়বস্তু — নব্য বাবু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খলতা।

★ ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনের বিষয়বস্তু — সনাতনপন্থী সমাজপতিদের নৈতিক অধঃপতন।

★ মধুসূদন প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন — পদ্মাবতী (১৮৬০) নাটকে।

★ ‘পদ্মাবতী’ নাটকের ভিত্তি — গ্রিক পুরাণের ‘অ্যাপেল অফ ডিসকর্ড’ গল্প।

★ ‘পদ্মাবতী’ নাটকে গ্রিক পুরাণের জুনো, প্যালাস ও ভেনাস — শচী, মুরজা ও রতি।

★ ‘পদ্মাবতী’ নাটকে হেলেন ও প্যারিস — পদ্মাবতী ও ইন্দ্রনীল।

★ মধুসূদনের অসমাপ্ত নাটক — মায়াকানন (১৮৭৪, সমাপ্ত করেন ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়)।

★ অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত প্রথম কাব্য — তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০)।

★ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ও প্রথম সার্থক মহাকাব্য — মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)।

★ মধুসূদন দত্তের একমাত্র গীতিকাব্য — ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১)।

★ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাটকীয় ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি — কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১)।

★ বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রকাব্য — বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২)।

★ ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যে পত্রের সংখ্যা — ১১টি।

★ বাংলা সাহিত্যের প্রথম চতুর্দশপদী কবিতার বই — চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬)।

★ হোমরের ‘ইলিয়ড’ অবলম্বনে রচিত অনুবাদ গদ্যগ্রন্থ — হেকটর বধ (১৮৭১)।

★ মধুসূদনের ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ — The Captive Ladie, Visions of the Past।

★ মধুসূদনের ইংরেজি কাব্যনাট্য — রিজিয়া: ইমপ্রেস অফ ইন্ড (Rizia: Empress of Inde)।

★ মধুসূদন রচিত ইংরেজি প্রবন্ধ — The Anglo-Saxon and the Hindu, On Poetry etc.।

★ দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন — মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

★ মধুসূদন দত্তের সাহিত্য জীবনের অনুপ্রেরণা — লর্ড বায়রন ও হোমার।

★ বাংলা কাব্যে প্রথম ‘হোমেরিক স্টাইল’ প্রবর্তন করেন — মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

★ “আমি এক সকালে উঠে নিজেকে সফল হিসেবে পাই নি…” — উক্তিটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের।

★ মধুসূদন দত্তের মৃত্যুস্থান — কলকাতার আলিপুর জেনারেল হাসপাতাল।

★ মধুসূদন দত্তের সমাধি অবস্থিত — কলকাতার সার্কুলার রোডে।

★ মধুসূদনের সমাধিতে খোদাই করা কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তি — ‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে!’।

★ “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশ সংকলিত হয়েছে — ‘মেঘনাদবধ-কাব্য’-এর ষষ্ঠ সর্গ থেকে।

★ ‘মেঘনাদবধ-কাব্য’-এর ষষ্ঠ সর্গের নাম — ‘বধো’ (বধ)।

★ ‘মেঘনাদবধ-কাব্য’-এ মোট সর্গ সংখ্যা — ৯টি (নয়টি)।

★ লঙ্কাপুরী আক্রান্ত হয় — রামচন্দ্র কর্তৃক।

★ যুদ্ধে নিহত রাবণের ভাই ও পুত্র — কুম্ভকর্ণ (ভাই) ও বীরবাহু (পুত্র)।

★ মহাযুদ্ধের সেনাপতি হিসেবে বরণ করা হয় — মেঘনাদকে।

★ মেঘনাদের ইষ্টদেবতা — বৈশ্বানর বা অগ্নিদেব।

★ মেঘনাদ পূজা সম্পন্ন করতে গিয়েছিলেন — নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে।

★ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণ প্রবেশ করে — মায়াদেবী ও বিভীষণের সহায়তায়।

★ রামায়ণের রাম-লক্ষ্মণকে হীনরূপে এবং রাবণ-মেঘনাদকে মানবীয় গুণসম্পন্ন করেছেন — মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

★ “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটি রচিত ছন্দ — অমিত্রাক্ষর ছন্দ (অক্ষরবৃত্ত)।

★ “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশের প্রতি পঙ্‌ক্তিতে মোট মাত্রা — ১৪ মাত্রা।

★ “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশের পর্ব বিন্যাস — ৮ + ৬ মাত্রা।

★ অমিত্রাক্ষর ছন্দের মূল বৈশিষ্ট্য — চরণান্তিক মিলহীনতা এবং যতিপাতের স্বাধীন ব্যবহার।

★ “এতক্ষণে”- অরিন্দম কহিলা বিষাদে— — বক্তা মেঘনাদ।

★ অরিন্দম শব্দের অর্থ — শত্রুকে দমন করে যে (এখানে মেঘনাদ)।

★ পশিল শব্দের অর্থ — প্রবেশ করল।

★ রক্ষঃপুর শব্দের অর্থ — রাক্ষসদের নগরী বা পুরী।

★ রক্ষঃশ্রেষ্ঠ — রাক্ষসদের শ্রেষ্ঠ (রাবণ)।

★ তাত শব্দের অর্থ — পিতা (এখানে কাকা/পিতৃব্য বিভীষণ অর্থে)।

★ নিকষা — রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণের মা।

★ শূলীশম্ভুনিভ শব্দের অর্থ — শূলপাণি মহাদেবের মতো।

★ শূলীশম্ভুনিভ বলা হয়েছে — কুম্ভকর্ণকে।

★ রাবণের মধ্যম সহোদর — কুম্ভকর্ণ।

★ বাসববিজয়ী বলা হয়েছে — মেঘনাদকে (ইন্দ্রজিত)।

★ বাসব শব্দের অর্থ — দেবরাজ ইন্দ্র।

★ তস্কর শব্দের অর্থ — চোর (এখানে লক্ষ্মণকে বোঝানো হয়েছে)।

★ গঞ্জি শব্দের অর্থ — তিরস্কার করি বা ভর্ৎসনা করি।

★ রামানুজ — রামের অনুজ (ছোট ভাই) লক্ষ্মণ।

★ শমন-ভবন শব্দের অর্থ — যমালয় বা মৃত্যুপুরী।

★ ভঞ্জিব আহবে শব্দের অর্থ — যুদ্ধের মাধ্যমে বিনষ্ট বা দূর করব।

★ আহবে শব্দের অর্থ — যুদ্ধে।

★ ধীমান্ শব্দের অর্থ — জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান।

★ রাঘব — রঘুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান (রামচন্দ্র)।

★ রাঘবদাস — রামচন্দ্রের আজ্ঞাবহ (বিভীষণ)।

★ রাবণি — রাবণের পুত্র (মেঘনাদ)।

★ “স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে” — বিধাতা চাঁদকে নিশ্চল আকাশে বা মহাদেবের ললাটে স্থাপন করেছেন।

★ বিধু শব্দের অর্থ — চাঁদ।

★ স্থাণু শব্দের অর্থ — নিশ্চল বা শিব।

★ রক্ষোরথী — রাক্ষস বীর (বিভীষণ)।

★ শৈবালদলের ধাম — শেওলাযুক্ত পুকুর বা বদ্ধ জলাশয়।

★ মৃগেন্দ্র কেশরী শব্দের অর্থ — পশুর রাজা সিংহ।

★ মৃগেন্দ্র শব্দের অর্থ — পশুরাজ।

★ কেশরী শব্দের অর্থ — কেশরযুক্ত প্রাণী (সিংহ)।

★ বীরকেশরী বলা হয়েছে — বিভীষণকে।

★ শৃগাল বলে সম্বোধন করা হয়েছে — রাম-লক্ষ্মণকে।

★ ক্ষুদ্রমতি নর — নীচ বা সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষ (লক্ষ্মণ)।

★ সৌমিত্রি — সুমিত্রার সন্তান লক্ষ্মণ।

★ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে অস্ত্রহীন অবস্থায় ছিলেন — মেঘনাদ।

★ প্রগল্‌ভে শব্দের অর্থ — নির্ভীক চিত্তে।

★ দম্ভী শব্দের অর্থ — দাম্ভিক (লক্ষ্মণ)।

★ নন্দন কানন — স্বর্গের উদ্যান।

★ “প্রফুল্ল কমলে কীটবাস?” — এখানে কমলের সাথে তুলনা করা হয়েছে লঙ্কাপুরীকে এবং কীটের সাথে লক্ষ্মণকে।

★ “মহামন্ত্র-বলে যথা নম্রশিরঃ ফণী” — এখানে ফণী বা সাপের সাথে তুলনা করা হয়েছে বিভীষণকে।

★ ফণী শব্দের অর্থ — সাপ।

★ ভর্ৎস শব্দের অর্থ — ভর্ৎসনা বা তিরস্কার করছ।

★ মজাইলা শব্দের অর্থ — বিপদগ্রস্ত করলে।

★ বসুধা শব্দের অর্থ — পৃথিবী।

★ তেঁই শব্দের অর্থ — তজ্জন্য বা সেহেতু।

★ রুষিলা শব্দের অর্থ — রাগান্বিত হলো।

★ বাসবত্রাস — দেবরাজ ইন্দ্রের ভয়ের কারণ (মেঘনাদ)।

★ জীমূতেন্দ্র শব্দের অর্থ — মেঘের গর্জন বা আওয়াজ।

★ বলী শব্দের অর্থ — বলবান বা বীর।

★ জলাঞ্জলি শব্দের অর্থ — সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা।

★ “গুণহীন স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা!” — উক্তিটি শাস্ত্রে উল্লিখিত বাণী (মেঘনাদের মুখে উচ্চারিত)।

★ “গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি।” — ‘বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ’ কবিতার সর্বশেষ চরণ।

শব্দার্থ ও টীকা

শব্দ / বাক্যাংশঅর্থ / ব্যাখ্যা
বিভীষণরাবণের কনিষ্ঠ সহোদর। রাম-রাবণের যুদ্ধে স্বপক্ষ ত্যাগকারী ও রামের ভক্ত।
‘এতক্ষণে’– অরিন্দম কহিলারুদ্ধদ্বার নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের অনুপ্রবেশের অন্যতম কারণ যে পথপ্রদর্শক বিভীষণ, তা অনুধাবন করে বিস্মিত ও বিপন্ন মেঘনাদের প্রতিক্রিয়া।
অরিন্দমঅরি বা শত্রুকে দমন করে যে। এখানে মেঘনাদকে বোঝানো হয়েছে।
পশিলপ্রবেশ করল।
রক্ষঃপুরেরাক্ষসদের পুরীতে বা নগরে (এখানে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে)।
রক্ষঃশ্রেষ্ঠরাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ; রাবণ।
তাতপিতা (এখানে পিতৃব্য বা চাচা অর্থে ব্যবহৃত)।
নিকষারাবণের মা।
শূলীশম্ভুনিভশূলপাণি মহাদেবের মতো।
কুম্ভকৰ্ণরাবণের মধ্যম সহোদর।
বাসববিজয়ীদেবতাদের রাজা ইন্দ্র বা বাসবকে জয় করেছে যে (মেঘনাদ)। এই কারণে মেঘনাদের অপর নাম ‘ইন্দ্রজিৎ’।
তস্করচোর।
গঞ্জিতিরস্কার করি।
রামানুজরাম+অনুজ = রামানুজ। এখানে রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণকে বোঝানো হয়েছে।
শমন-ভবনেযমালয়ে।
ভঞ্জিব আহবেযুদ্ধদ্বারা বিনষ্ট করব।
আহবেযুদ্ধে।
ধীমান্ধীসম্পন্ন বা জ্ঞানী।
রাঘবরঘুবংশের শ্রেষ্ঠ সন্তান (এখানে রামচন্দ্রকে বোঝানো হয়েছে)।
রাঘবদাসরামচন্দ্রের আজ্ঞাবহ।
রাবণিরাবণের পুত্র (এখানে মেঘনাদকে বোঝানো হয়েছে)।
স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটেবিধাতা চাঁদকে নিশ্চল আকাশে স্থাপন করেছেন।
বিধুচাঁদ।
স্থাণুনিশ্চল।
রক্ষোরথীরক্ষকুলের বীর।
রথীরথচালক; যে রথচালনার মাধ্যমে যুদ্ধ করে।
শৈবালদলের ধামপুকুর বা বদ্ধ জলাশয়।
শৈবালশেওলা।
মৃগেন্দ্র কেশরীকেশরযুক্ত পশুরাজ সিংহ।
মৃগেন্দ্ৰপশুরাজ সিংহ।
কেশরীকেশরযুক্ত প্রাণী; সিংহ।
মহারথীমহাবীর বা শ্রেষ্ঠ বীর।
মহারথীপ্রথাশ্রেষ্ঠ বীরদের আচরণ-প্রথা বা যুদ্ধের নিয়ম।
সৌমিত্রিলক্ষ্মণ (সুমিত্রার গর্ভজাত সন্তান বলে লক্ষ্মণের অপর নাম সৌমিত্রি)।
নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারলঙ্কাপুরীতে মেঘনাদের যজ্ঞস্থান, যেখানে যজ্ঞ করে মেঘনাদ যুদ্ধে যেত। ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’ যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে নিরস্ত্র মেঘনাদ নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতা অগ্নিদেবের পূজারত অবস্থায় লক্ষ্মণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে নিহত হয়।
প্রগল্‌ভেনির্ভীক চিত্তে।
দম্ভীদম্ভ করে যে; দাম্ভিক।
নন্দন কাননস্বর্গের উদ্যান।
মহামন্ত্র বলে যথা নম্রশিরঃ ফণীমন্ত্রপূত সাপ যেমন মাথা নত করে।
লক্ষিলক্ষ করে।
ভর্ৎসভর্ৎসনা বা তিরস্কার করছ।
মজাইলাবিপদগ্রস্ত করলে।
বসুধাপৃথিবী।
তেঁইতজ্জন্য বা সেহেতু।
রুষিলারাগান্বিত হলো।
বাসবত্রাসবাসবের (ইন্দ্রের) ভয়ের কারণ যে মেঘনাদ।
মন্ত্রশব্দ বা ধ্বনি।
জীমূতেন্দ্ৰমেঘের ডাক বা আওয়াজ।
বলীবলবান বা বীর।
জলাঞ্জলিসম্পূর্ণ পরিত্যাগ।
শাস্ত্রে বলে, পরঃ পরঃ সদা!শাস্ত্রমতে গুণহীন হলেও নির্গুণ স্বজনই শ্রেয়, কেননা গুণবান হলেও পর সর্বদা পরই থেকে যায়।
নীচহীন, নিকৃষ্ট বা ইতর।
দুর্মতিঅসৎ বা মন্দ বুদ্ধি।

পাঠ-পরিচিতি

“বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটুকু মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’-র ‘বধো’ (বধ) নামক ষষ্ঠ সর্গ থেকে সংকলিত হয়েছে। সর্বমোট নয়টি সর্গে বিন্যস্ত ‘মেঘনাদবধ-কাব্যে’র ষষ্ঠ সর্গে লক্ষ্মণের হাতে অন্যায় যুদ্ধে মৃত্যু ঘটে অসমসাহসী বীর মেঘনাদের। রামচন্দ্র কর্তৃক দ্বীপরাজ্য স্বর্ণলঙ্কা আক্রান্ত হলে রাজা রাবণ শত্রুর উপর্যুপরি দৈব-কৌশলের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ ও পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর পর মেঘনাদকে পিতা রাবণ পরবর্তী দিবসে অনুষ্ঠেয় মহাযুদ্ধের সেনাপতি হিসেবে বরণ করে নেন। যুদ্ধজয় নিশ্চিত করার জন্য মেঘনাদ যুদ্ধযাত্রার পূর্বেই নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ইষ্টদেবতা অগ্নিদেবের পূজা সম্পন্ন করতে মনস্থির করে। মায়া দেবীর আনুকূল্যে এবং রাবণের অনুজ বিভীষণের সহায়তায়, লক্ষ্মণ শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশে সমর্থ হয়। কপট লক্ষ্মণ নিরস্ত্র মেঘনাদের কাছে যুদ্ধ প্রার্থনা করলে মেঘনাদ বিস্ময় প্রকাশ করে। শত শত প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে লক্ষ্মণের অনুপ্রবেশ যে মায়াবলে সম্পন্ন হয়েছে, বুঝতে বিলম্ব ঘটে না তার। ইতোমধ্যে লক্ষ্মণ তলোয়ার কোষমুক্ত করলে মেঘনাদ যুদ্ধসাজ গ্রহণের জন্য সময় প্রার্থনা করে লক্ষ্মণের কাছে। কিন্তু লক্ষ্মণ তাকে সময় না দিয়ে আক্রমণ করে। এ সময়ই অকস্মাৎ যজ্ঞাগারের প্রবেশদ্বারের দিকে চোখ পড়ে মেঘনাদের; দেখতে পায় বীরযোদ্ধা পিতৃব্য বিভীষণকে মুহূর্তে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যায় তার কাছে। খুল্লতাত বিভীষণকে প্রত্যক্ষ করে দেশপ্রেমিক নিরস্ত্র মেঘনাদ যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, সেই নাটকীয় ভাষ্যই “বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” অংশে সংকলিত হয়েছে। এ অংশে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয়েছে ঘৃণা। জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও জাতিসত্তার সংহতির গুরুত্বের কথা যেমন এখানে ব্যক্ত হয়েছে তেমনি এর বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রকে অভিহিত করা হয়েছে নীচতা ও বর্বরতা বলে ।

উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাল্মীকি-রামায়ণকে নবমূল্য দান করেছেন এ কাব্যে। মানবকেন্দ্রিকতাই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সারকথা। ওই নবজাগরণের প্রেরণাতেই রামায়ণের রাম-লক্ষ্মণ মধুসূদনের লেখনীতে হীনরূপে এবং রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদ যাবতীয় মানবীয় গুণের ধারকরূপে উপস্থাপিত। দেবতাদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত রাম-লক্ষ্মণ নয়, পুরাণের রাক্ষসরাজ রাবণ ও তার পুত্র মেঘনাদের প্রতিই মধুসূদনের মমতা ও শ্রদ্ধা।

“বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ” কাব্যাংশটি ১৪ মাত্রার অমিল প্রবহমান যতিস্বাধীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। প্রথম পঙ্ক্তির সঙ্গে দ্বিতীয় পক্তির চরণান্তের মিলহীনতার কারণে এ ছন্দ ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ নামে সমধিক পরিচিত। এ কাব্যাংশের প্রতিটি পক্তি ১৪ মাত্রায় এবং ৮ + ৬ মাত্রার দুটি পর্বে বিন্যস্ত। লক্ষ করার বিষয় যে, এখানে দুই পঙ্ক্তির চরণান্তিক মিলই কেবল পরিহার করা হয়নি, যতিপাত বা বিরামচিহ্নের স্বাধীন ব্যবহারও হয়েছে বিষয় বা বক্তব্যের অর্থের অনুষঙ্গে। এ কারণে ভাবপ্রকাশের প্রবহমানতাও কাব্যাংশটির ছন্দের বিশেষ লক্ষণ হিসেবে বিবেচ্য।


HSC বাংলা বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতার স্মার্ট নোট PDF Download

সমাধানে যদি কোনো ভুল খুঁজে পান, তবে দয়া করে আমাদের জানিয়ে সাহায্য করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার রেটিং দিন:

Scroll to Top