HSC তাহারেই পড়ে মনে কবিতার নোট পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট নোট। এখানে সারাংশ, ব্যাখ্যা, শব্দার্থ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, MCQ, CQ এবং পরীক্ষা উপযোগী বিশ্লেষণ একসাথে সাজানো হয়েছে। নিচে সম্পূর্ণ নোট পড়ুন অথবা PDF Download করুন।
তাহারেই পড়ে মনে কবিতার নোট
পরিচিতি
- জন্ম: ২০ জুন ১৯১১, শায়েস্তাবাদ, বাকেরগঞ্জ (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ)
- মৃত্যু: ২০ নভেম্বর ১৯৯৯
- পরিচয়: কবি, লেখিকা, নারীবাদী, আধুনিক নারী প্রগতি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব
পারিবারিক পটভূমি
- সম্ভ্রান্ত বাঙালি মুসলিম জমিদার (সৈয়দ) বংশের সন্তান — ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিলাউর
- বাবা সৈয়দ আব্দুল বারী চাকরি-সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে যান যখন তার বয়স ৭ বছর
- মা সৈয়দা সাবেরা বেগমের সাথে নানাবাড়িতে বেড়ে ওঠেন
- পরিবারের ভাষা ছিল উর্দু; বাংলা শেখেন মায়ের কাছ থেকে
- নানাবাড়ির গ্রন্থাগারে বই পড়ার সুযোগ পান
ব্যক্তিগত জীবন
| ঘটনা | সাল |
| মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে বিয়ে (বয়স ১১) | ১৯২২ |
| স্বামী নেহালের আকস্মিক মৃত্যু | ১৯৩২ |
| কামালউদ্দিন আহমেদের সাথে দ্বিতীয় বিয়ে | ১৯৩৯ |
- প্রথম স্বামী নেহাল তাকে সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবায় উৎসাহ দেন
- বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সাথে পরিচয় ও তার প্রভাব শৈশব থেকেই গভীর ছিল
সাহিত্যিক যাত্রা
- প্রথম কবিতা “বাসন্তী” (সওগাত পত্রিকা) — ১৯২৬
- কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্রের সংস্পর্শে আসেন
- কেয়ার কাঁটা (গল্প সংকলন) — ১৯৩৭
- সাঁঝের মায়া (প্রথম কাব্যগ্রন্থ, মুখবন্ধ নজরুল ইসলামের) — ১৯৩৮
- কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা (১৯৩২–১৯৪২)
- নারীদের সাময়িকী “বেগম”-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদিকা
উল্লেখযোগ্য রচনা
কবিতা: সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, প্রশস্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী, দিওয়ান, অভিযাত্রিক, মৃত্তিকার ঘ্রাণ ভ্রমণকাহিনী: সোভিয়েতে দিনগুলি স্মৃতিকথা: একাত্তরের ডায়েরি আত্মজীবনী: একালে আমাদের কাল
সমাজসেবা ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা (ঢাকা পর্ব, ১৯৪৭-পরবর্তী)
- ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নারীদের উদ্বুদ্ধকরণ
- কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা — ১৯৫৬
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা হোস্টেলের নাম “রোকেয়া হল” রাখার দাবি
- ছায়ানট-এর সভাপতি নির্বাচিত — ১৯৬১ (রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদ আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত)
- মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি, তমঘা-ই-ইমতিয়াজ বর্জন — ১৯৬৯
- মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা — ১৯৭০
- ১৯৭১: অসহযোগ আন্দোলনে নারী মিছিলে নেতৃত্ব
- ১৯৯০: স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, কারফিউ উপেক্ষা করে মৌন মিছিল
- সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী আজীবন সংগ্রাম
পুরস্কার (৫০+টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য)
- তমঘা-ই-ইমতিয়াজ, পাকিস্তান (১৯৬১) — পরে বর্জিত
- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২)
- সোভিয়েত লেনিন পদক (১৯৭০)
- একুশে পদক (১৯৭৬)
- বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬)
- স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭)
মৃত্যু ও স্মরণ
- মৃত্যু: ২০ নভেম্বর ১৯৯৯
- পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত — বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে প্রথম এই সম্মানপ্রাপ্ত
- ২০ জুন ২০১৯: ১০৮তম জন্মদিনে গুগল ডুডল দ্বারা সম্মানিত
📌 কবিতার লাইনভিত্তিক সহজ ব্যাখ্যা
“হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়,
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
- ব্যাখ্যা: কবির ভক্ত বা অনুরাগী কবিকে প্রশ্ন করছেন—প্রকৃতিতে ফাল্গুন অর্থাৎ বসন্ত এসেছে। চারদিকে আনন্দের পরিবেশ, অথচ কবি আপনি কেন চুপচাপ হয়ে আছেন? বসন্তকে গ্রহণ বা বরণ করে নেওয়ার জন্য আপনি কি কোনো কবিতা বা গান (বন্দনা) রচনা করবেন না?
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি-
“দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি?
বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”
- ব্যাখ্যা: অনুরাগী পাঠকের প্রশ্নের উত্তরে কবি শান্ত ও বিষাদময় চোখে তাকিয়ে উল্টো কিছু প্রশ্ন করলেন। কবি জানতে চাইলেন—বসন্তের দক্ষিণা বাতাস আসার পথ (দক্ষিণ দুয়ার) কি খুলে গেছে? বাতাবি লেবুর ফুল কিংবা আমের মুকুল কি গাছে গাছে ফুটেছে? সেই ফুলের সুবাসে দক্ষিণা বাতাস কি ব্যাকুল ও বিভোর হয়ে উঠেছে? (অর্থাৎ বসন্তের এই স্বাভাবিক আগমন সম্পর্কে কবি যেন একদমই খেয়াল করেননি)।
“এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম, “কেন কবি আজ
এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?”
- ব্যাখ্যা: অনুরাগী পাঠক অবাক হয়ে বললেন—আপনি এখনও এগুলো লক্ষ্য করেননি? আপনার মন আজ কেন এত উদাস ও অন্যমনস্ক? নতুন ঋতুকে স্বাগত জানানোর জন্য আপনার যে নতুন ফুলের সাজে সাজার কথা, তা কোথায়?
কহিল সে সুদূরে চাহিয়া-
“অলখের পাথার বাহিয়া
তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?
ডেকেছে কি সে আমারে? শুনি নাই, রাখি নি সন্ধান।”
- ব্যাখ্যা: কবি একদৃষ্টিতে দূরের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন—অদৃশ্য সাগরের (অলখের পাথার) পথ ধরে বসন্তের তরী (নৌকা) কি অবশেষে এসে পৌঁছেছে? তাকে স্বাগত জানানোর গান কি বেজে উঠেছে? সে কি আমাকে ডেকেছে? বিষাদগ্রস্ত কবি বললেন—আমি তো কিছুই শুনিনি, আর এর কোনো খবরও রাখিনি।
কহিলাম, “ওগো কবি! রচিয়া লহ না আজও গীতি,
বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি- এ মোর মিনতি।”
- ব্যাখ্যা: ভক্ত কবিকে অনুরোধ করে বললেন—হয়তো আগে খবর রাখেননি, কিন্তু আজও তো সময় আছে! আজই একটি গান রচনা করুন। আপনার গলায় বসন্তকে স্বাগত জানানোর গান শোনার জন্য আমি আকুল হয়ে মিনতি করছি।
কহিল সে মৃদু মধু-স্বরে-
“নাই হলো, না হোক এবারে-
আমারে গাহিতে গান, বসন্তেরে আনিতে বরিয়া-
রহেনি, সে ভুলেনি তো, এসেছে তা ফাগুনে স্মরিয়া।”
- ব্যাখ্যা: কবি খুব মৃদু ও মিষ্টি স্বরে উত্তর দিলেন—এবার নাহয় আমি গান না-ই বা গাইলাম। আমি গান গেয়ে তাকে বরণ না করলেও বসন্ত তো আমাকে বা প্রকৃতিকে ভুলে থাকেনি! ফাল্গুন মাস আসতেই সে ঠিকই নিজের নিয়মে চলে এসেছে।
কহিলাম : “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”
- ব্যাখ্যা: ভক্ত তখন ভাবলেন কবি হয়তো বসন্তের ওপর কোনো কারণে অভিমান করে আছেন। তিনি বললেন—বসন্ত আপনার জন্য অপেক্ষা না করে নিজে থেকে চলে এসেছে বলে কি আপনি অভিমান করেছেন? বসন্ত এলো ঠিকই, কিন্তু আপনি তাকে বরণ করলেন না বলে তার এই আগমন যেন ব্যর্থ হয়ে গেল।
কহিল সে পরম হেলায়-
“বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়
ফুল কি ফোটেনি শাখে? পুষ্পারতি লভেনি কি ঋতুর রাজন?
মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নাই অর্ঘ্য বিরচন?”
- ব্যাখ্যা: কবি উদাসীন ও অবহেলার সুরে বললেন—বসন্তের আসা কেন ব্যর্থ হবে? গাছে গাছে কি ফুল ফোটেনি? ঋতুরাজ বসন্ত কি প্রকৃতির এই পুষ্প-উপহার (পুষ্পারতি) পায়নি? মাধবী ফুলের কুঁড়িতে কি গন্ধ নেই, নাকি সে সাজ ডালা গুছিয়ে (অর্ঘ্য বিরচন) বসন্তকে বরণ করেনি? বসন্তের রূপ-রস তো সবই ঠিকঠাক আছে, আমার না লেখায় কিছুই আটকে নেই।
“হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”
কহিলাম, “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”
- ব্যাখ্যা: ভক্ত আবার প্রশ্ন করলেন—প্রকৃতিতে সব ফুটুক, তাও ঋতুরাজ বসন্তের প্রতি আপনার কেন এত বিরাগ ও উদাসীনতা? এভাবে বসন্তকে অবহেলা করে আপনি তাকে কেন আঘাত দিচ্ছেন?
কহিল সে কাছে সরে আসি –
“কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোনো মতে।”
- ব্যাখ্যা: এবার কবি ভক্তের কাছে একটু ঘেঁষে এসে নিজের আসল বেদনার কথা প্রকাশ করলেন। কবি বললেন—শীতকাল (মাঘের সন্ন্যাসী) কুয়াশার চাদর (কুহেলি উত্তরী) মুড়ি দিয়ে গাছের সব ফুল ও পাতা ঝরিয়ে খালি হাতে (রিক্ত হস্তে) দিগন্তের পথে চলে গেছে। অর্থাৎ, শীতের বিদায়ের সাথে সাথে কবির জীবন থেকে তাঁর অত্যন্ত প্রিয় মানুষ (কবির প্রথম স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেন) চিরতরে হারিয়ে গেছেন। প্রকৃতির বর্ণিল বসন্ত এলেও কবির মনে সেই প্রিয়জনকে হারানোর শীতের শূন্যতাই হাহাকার করছে। কবি সেই বিচ্ছেদ-বেদনা ও প্রিয় মানুষকে কিছুতেই ভুলতে পারছেন না, বারবার কেবল ‘তাহারেই পড়ে মনে’।
কবিতাটিতে একদিকে প্রকৃতির আনন্দময় বসন্তের আগমন, অন্যদিকে কবির হৃদয়ে প্রিয়জন হারানোর বিচ্ছেদ ও শূন্যতা—এই দুইয়ের বিপরীতমুখী আবেগ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য যত উজ্জ্বলই হোক না কেন, ভেতরের শোক ও প্রিয়জনের স্মৃতি কবিকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে তিনি বসন্তের আনন্দকে স্পর্শ করতে পারছেন না।
তাহারেই পড়ে মনে — শব্দার্থ ও টীকা
| শব্দ/পঙক্তি | অর্থ ও ব্যাখ্যা |
| হে কবি | কবিভক্ত এখানে কবিকে সম্বোধন করেছেন |
| নীরব কেন | উদাসীন হয়ে আছেন কেন? কেন কাব্য ও গান রচনায় সক্রিয় হচ্ছেন না |
| ফাল্গুন যে এসেছে ধরায় | পৃথিবীতে ফাল্গুন অর্থাৎ বসন্তের আবির্ভাব ঘটেছে |
| তব বন্দনায় | তোমার রচিত বন্দনা-গানের সাহায্যে; অর্থাৎ বন্দনা-গান রচনা করে বসন্তকে কি তুমি বরণ করে নেবে না? |
| দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি? | কবির জিজ্ঞাসা — বসন্তের দখিনা বাতাস বইতে শুরু করেছে কি না। উদাসীন কবি যে তা লক্ষ করেননি, তার এই জিজ্ঞাসা থেকে তা স্পষ্ট হয় |
| বাতাবি নেবুর ফুল…অধীর আকুল | বসন্তের আগমনে বাতাবি লেবুর ফুল ও আমের মুকুলের গন্ধে দখিনা বাতাস দিগ্বিদিক সুগন্ধে ভরে তোলে। কিন্তু উন্মনা কবি এসব কিছুই লক্ষ করেননি। কবির জিজ্ঞাসা তাঁর উদাসীনতাকেই স্পষ্ট করে |
| এখনো দেখনি তুমি? | কবিভক্তের এ কথায় আমরা নিশ্চিত হই প্রকৃতিতে বসন্তের সব লক্ষণ মূর্ত হয়ে উঠেছে। অথচ কবি তা লক্ষ করছেন না |
| কোথা তব নব পুষ্পসাজ | বসন্ত এসেছে অথচ কবি নতুন ফুলে ঘর সাজাননি। নিজেও ফুলের অলংকারে সাজেননি |
| অলখ | অলক্ষ। দৃষ্টি অগোচরে |
| পাথার | সমুদ্র |
| বসন্তেরে আনিতে…ফাল্গুন স্মরিয়া | কবি বন্দনা-গান রচনা করে বসন্তকে বর্ণনা না করলেও বসন্ত অপেক্ষা করেনি। ফাল্গুন আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে বসন্ত এসেছে |
| করিলে বৃথাই | ব্যর্থ করলে; অর্থাৎ কবি-ভক্তের অনুযোগ — বসন্তকে কবি বরণ না করায় বসন্তের আবেদন গুরুত্ব হারিয়েছে |
| পুষ্পারতি | ফুলেল বন্দনা বা নিবেদন |
| পুষ্পারতি লভে নি কি ঋতুর রাজন? | ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ ও বন্দনা করার জন্য গাছে গাছে ফুল ফোটেনি? অর্থাৎ বসন্তকে সাদর অভ্যর্থনা জানানোর জন্যেই যেন ফুল ফোটে |
| মাধবী | বাসন্তী লতা বা তার ফুল |
| অর্ঘ্য বিরচন | অঞ্জলি বা উপহার রচনা। প্রকৃতি বিচিত্র সাজে সজ্জিত হয়ে ফুল ও তার সৌরভ উপহার দিয়ে বসন্তকে বরণ করে |
| উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা | কবিভক্ত বুঝতে পারছেন না, কবি যথারীতি সানন্দে বসন্ত বন্দনা না করে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছেন কেন |
| কুহেলি | কুয়াশা |
| উত্তরী | চাদর, উত্তরীয় |
| কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী | কবি শীতকে মাঘের সন্ন্যাসীরূপে কল্পনা করেছেন — যে সন্ন্যাসী কুয়াশার চাদর পরিধান করে আছে |
| পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে | শীত প্রকৃতিতে দেয় রিক্ততার রূপ, গাছের পাতা যায় ঝরে, গাছ হয় ফুলহীন। শীতের এ রূপকে বসন্তের বিপরীতে স্থাপন করা হয়েছে। প্রকৃতি বসন্তের আগমনে ফুলের সাজে সাজলেও কবির মন জুড়ে আছে শীতের রিক্ততার ছবি। শীত যেন সর্বরিক্ত সন্ন্যাসীর মতো কুয়াশার চাদর গায়ে পত্রপুষ্পহীন দিগন্তের পথে চলে গেছে |
| তাহারেই পড়ে মনে | প্রকৃতিতে বসন্ত এলেও কবির মন জুড়ে আছে শীতের রিক্ত ও বিষণ্ণ ছবি। কবির মন দুঃখভারাক্রান্ত, তার কণ্ঠ নীরব। শীতের করুণ বিদায়কে তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। তাই বসন্ত তার মনে কোনো সাড়া জাগাতে পারছে না — বসন্তের সৌন্দর্য তার কাছে অর্থহীন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাঁর প্রথম স্বামী ও কাব্যসাধনার প্রেরণা-পুরুষের আকস্মিক মৃত্যুতে কবির অন্তরে যে বিষণ্ণতা জাগে, তারই সুস্পষ্ট প্রভাব ও ইঙ্গিত এ কবিতায় ফুটে উঠেছে |
পাঠ-পরিচিতি
“তাহারেই পড়ে মনে” কবিতাটি ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় । এ কবিতায় প্রকৃতি ও মানবমনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাৎপর্যময় অভিব্যক্তি পেয়েছে । সাধারণভাবে প্রকৃতির- সৌন্দর্য মানবমনের অফুরন্ত আনন্দের উৎস। বস্তুত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যে কবিমনে আনন্দের শিহরণ জাগাবে এবং তিনি তাকে ভাবে ছন্দে সুরে ফুটিয়ে তুলবেন সেটাই প্রত্যাশিত কিন্তু কবিমন যদি কোনো কারণে ক শোকাচ্ছন্ন কিংবা বেদনা-ভারাতুর থাকে তবে বসন্ত তার সমস্ত সৌন্দর্য সত্ত্বেও কবির অন্তরকে স্পর্শ করতে পারবে না।
এ কবিতায় কবির ব্যক্তিজীবনের দুঃখময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে। তাঁর সাহিত্য সাধনার প্রধান সহায়ক ও উৎসাহদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে (১৯৩২) কবির জীবনে প্রচণ্ড শূন্যতা নেমে আসে । তাঁর ব্যক্তিজীবন ও কাব্যসাধনার ক্ষেত্রে নেমে আসে এক দুঃসহ বিষণ্ণতা। কবিমন আচ্ছন্ন হয়ে যায় রিক্ততার হাহাকারে । “তাহারেই পড়ে মনে” কবিতাকে আচ্ছন্ন করে আছে এই বিষাদময় রিক্ততার সুর । তাই বসন্ত এলেও উদাসীন কবির অন্তর জুড়ে রিক্ত শীতের করুণ বিদায়ের বেদনা ।
কবিতাটির আরেকটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর নাটকীয়তা । গঠনরীতির দিক থেকে এটি সংলাপনির্ভর রচনা কবিতার আবেগময় ভাববস্তুর বেদনাঘন বিষণ্ণতার সুর এবং সুললিত ছন্দ এতই মাধুর্যমণ্ডিত যে তা সহজেই পাঠকের অন্তর ছুঁয়ে যায়।
তাহারেই পড়ে মনে কবিতার নোট PDF Download