সোনার তরী কবিতার নোট ২০২৬: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘সোনার তরী’ বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সৃষ্টি, যা কেবল একটি কবিতা নয়—এটি মানবজীবনের এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি। মহাকালের স্রোতে মানুষের নশ্বর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও তার সৃষ্টিকর্ম কীভাবে অমরত্ব লাভ করে, সেই চিরন্তন সত্যটিই এখানে শিল্পিত রূপে ধরা দিয়েছে।
সোনার তরী কবিতার নোট ২০২৬
লেখক পরিচিতি:
জীবন ও পারিবারিক পরিচয়
- জন্ম: ৭ মে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ (১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ)।
- জন্মস্থান: জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, কলকাতা।
- পিতা: মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
- মাতা: সারদা দেবী।
- পিতামহ: প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।
- ছদ্মনাম: ভানুসিংহ ঠাকুর।
- মৃত্যু: ৭ আগস্ট ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ)।
বিশেষ উপাধি ও সম্মাননা
| উপাধি | দাতা/প্রদানকারী |
| গুরুদেব | মহাত্মা গান্ধী |
| বিশ্বকবি | ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় |
| কবিগুরু | বিভিন্ন জন (প্রচলিত) |
| নাইট (Knight) | ব্রিটিশ সরকার (১৯১৫ সালে, তবে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১৯১৯ সালে বর্জন করেন) |
| ডক্টরেট (D. Litt) | অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
| নোবেল পুরস্কার | সুইডিশ একাডেমি (১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings কাব্যগ্রন্থের জন্য) |
সাহিত্যকর্মের গুরুত্বপূর্ণ দিক : সোনার তরী কবিতার নোট
- বাংলা ছোটগল্পের জনক: তিনি বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের ধারা প্রবর্তন করেন এবং ‘গল্পগুচ্ছ’ তাঁর বিখ্যাত সংকলন।
- প্রথম কাব্যগ্রন্থ: বনফুল (১৮৭৬, ১৫ বছর বয়সে)।
- শেষ লেখা: কাব্যগ্রন্থ ‘শেষলেখা’ (মৃত্যুর পরে প্রকাশিত)।
- ‘সোনার তরী’ (১৮৯৪): এই কাব্যগ্রন্থে তাঁর ‘জীবনদেবতা’ তত্ত্বের উন্মেষ ঘটে।
- জাতীয় সঙ্গীত: তিনি ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা:
- ভারত: জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে
- বাংলাদেশ: আমার সোনার বাংলা
বিভাগ অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য রচনা
| সাহিত্যের শাখা | প্রধান রচনা ও প্রকাশকাল |
| কাব্যগ্রন্থ | মানসী (১৮৯০), সোনার তরী (১৮৯৪), চিত্রা (১৮৯৬), ক্ষণিকা (১৯০০), গীতাঞ্জলি (১৯১০), বলাকা (১৯১৬)। |
| উপন্যাস | চোখের বালি (১৯০৩), গোরা (১৯১০), ঘরে-বাইরে (১৯১৬), শেষের কবিতা (১৯২৯)। |
| নাটক/নৃত্যনাট্য | বিসর্জন (১৮৯০), চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২), অচলায়তন (১৯১২), ডাকঘর (১৯১২), রক্তকরবী (১৯২৬)। |
| ছোটগল্প | পোস্টমাস্টার, ক্ষুধিত পাষাণ, একরাত্রি, নষ্টনীড় (তাঁর সেরা গল্পগুলির সংকলন ‘গল্পগুচ্ছ’)। |
| প্রবন্ধ | আধুনিক সাহিত্য, কালান্তর, সাহিত্যের স্বরূপ। |
| আত্মজীবনী | জীবনস্মৃতি (১৯১২), ছেলেবেলা (১৯৪০)। |
কর্মজীবন ও প্রতিষ্ঠান
- শান্তিনিকেতন: ১৯০১ সালে বোলপুরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই পরে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১) রূপে পরিচিত হয়।
- গ্রামীণ উন্নয়ন: তিনি শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরে জমিদারি তদারকি করার সময় গ্রামীণ জীবনকে কাছ থেকে দেখেন এবং কৃষিব্যাংক স্থাপন করেন।
- চিত্রশিল্পী: জীবনের শেষভাগে এসে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন এবং তাঁর চিত্রকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত হয়।
কবিতা পরিচিতি: সোনার তরী কবিতার নোট
- কাব্যগ্রন্থ: ‘সোনার তরী’ (নাম কবিতা)।
- প্রকাশকাল: ১৮৯৪ সাল (১২৯৮ বঙ্গাব্দে রচনা এবং ১৮৯৪ সালে প্রকাশিত)।
- নাম কবিতা: যখন কোনো কাব্যগ্রন্থের নাম এবং কবিতার নাম একই হয়, তখন সেই কবিতাকে নাম কবিতা বলে।
- উৎসর্গ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতাটি দেবেন্দ্রনাথ সেনকে উৎসর্গ করে লিখেছিলেন।
- ছন্দ: কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা। (এতে পূর্ণ পর্ব আছে, যার মাত্রা সংখ্যা ৬ বা ৭)
- মোট লাইন সংখ্যা: ৪২ টি।
- মোট স্তবক: ৬ টি স্তবক। (প্রতিটি স্তবকে ৭টি লাইন)
- ‘শূণ্য’ শব্দটি: মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কবিতায় থাকলে এর অক্ষর সংখ্যা হবে ৩ অক্ষর, আর অন্য কোনো অক্ষরবৃত্ত ছন্দের কবিতায় থাকলে হবে ২ অক্ষর।
কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের সংখ্যা: সোনার তরী কবিতার নোট
- তরী ⇨ ৪ বার (১৫, ২৩, ৩৬, ৪২)
- সোনার ⇨ ৩ বার (২৮, ৩৭, ৪২)
- সোনার ধান ⇨ ২ বার (৩৮, ৪৭)
- বরষা ⇨ ২ বার (১, ৭)
- ধান ⇨ ৪ বার (৭, ২৮, ৩৭, ৪)
- নদী ⇨ ৩ বার (৬, ৩২, ৪১)
- গগন ⇨ ২ বার (১, ৩৮)
কবিতার মূল উপজীব্য বিষয় ও দর্শন : সোনার তরী কবিতার নোট
- মূল উপজীব্য বিষয়: কর্মীর থেকে কর্মের মূল্যের গ্রহণযোগ্যতা। কবি এখানে মানুষের চেয়ে তার কাজের মূল্যকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
- দর্শন:
- সাধারণ তত্ত্ব: পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি (সাধারণভাবে দৃশ্যমান অর্থ)।
- দার্শনিক তত্ত্ব: কবির নিজস্ব মতামত।
- মূল ভাব (প্রতীকী অর্থ):
- কৃষক: শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক/শিল্পস্রষ্টা/মানুষের জীবন।
- মাঝি: মহাকালের প্রতীক।
- সোনার তরী: মহাকাল বা সময় রূপী নৌকা/পৃথিবী।
- ধান: মানুষের সৃষ্টিকর্ম/জীবনের ফসল/শিল্পকর্ম।
- ছোট খেত: মানুষের জীবন-পরিধি/মানুষের অস্তিত্বের স্থান।
- বাঁকা জল/ভরা নদী: অনন্ত কালস্রোত/মৃত্যু/বিপদ।
- মূল কথা: মানুষ পৃথিবীতে তার কর্মের মাধ্যমেই বেঁচে থাকে। মানুষ তার নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা নয়, বরং তার মহৎ কাজের মধ্য দিয়েই পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। মানুষের চেয়ে তার কর্মের মূল্যটাই অধিক।
আরো পড়ুন:
এইচএসসি অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধের নোট
এইচএসসি সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের নোট
নির্বাচিত অংশের ব্যাখ্যা : সোনার তরী কবিতার বিশ্লেষণ pdf
ক. প্রথম স্তবক (গগনে গরজে মেঘ… এলো বরষা)
| চরণ | ব্যাখ্যা (ভাবানুবাদ) |
| গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। /কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। | আকাশে মেঘ গর্জন করছে, এখন ভরা বর্ষাকাল। কৃষক কূলে একা বসে আছে, তার কোনো ভরসা নেই। (বৃষ্টি যেকোনো সময় শুরু হতে পারে)। |
| রাশি রাশি ভারা ভারা /ধান কাটা হলো সারা, /ভরা নদী ক্ষুরধারা /খরপরশা- /কাটতে কাটতে ধান এল বরষা। | রাশি রাশি ধান স্তূপ করে রাখা হয়েছে এবং ভরা নদীর স্রোত বর্ষার মতো তীক্ষ্ণ, ক্ষুরধার। ধান কাটতে কাটতেই বৃষ্টি চলে এলো। |
খ. দ্বিতীয় স্তবক (এখনি ছোট খেত… আমি একেলা) সোনার তরী কবিতার নোট
| চরণ | ব্যাখ্যা (ভাবানুবাদ) |
| একখানি ছোট খেত, আমি একেলা- /চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা। | কৃষক তার ছোট খেতের ওপর একা বসে আছে। চারপাশে বিপদ সংকুল জল (নদীর কালো স্রোত) খেলা করছে। |
| পরপারে দেখি আঁকা /তরুছায়ামসী মাখা /গ্রামখানি মেঘে ঢাকা /প্রভাতবেলা- /এ পারেতে ছোট খেত, আমি একেলা। | ওপারে অর্থাৎ ভবিষ্যতে কী হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। গাছপালায় মসীমাখা সেই গ্রামটি মেঘে ঢাকা। এদিকে এই ছোট্ট পৃথিবীতে সে একা। |
গ. তৃতীয় স্তবক (গান গেয়ে তরী বেয়ে… চিনি উহারে)
| চরণ | ব্যাখ্যা (ভাবানুবাদ) |
| গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে, / দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে। | কৃষক দেখতে পাচ্ছে যে কেউ একজন গান গাইতে গাইতে তরী বেয়ে আসছে। তাকে দেখে তার চেনা মনে হচ্ছে। (এখানে মাঝিকে বোঝানো হয়েছে)। |
| ভরা পালে চলে যায়, / কোনো দিকে নাহি চায়, / ঢেউগুলি নিরুপায় / ভাঙে দু’ধারে- / দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে। | মাঝির নৌকাটি দ্রুত ভরা পালে চলে যাচ্ছে, কারও দিকে দৃষ্টি নেই। তীব্র স্রোতে ঢেউগুলি নদীর দু’পাশে আছড়ে পড়ছে। এমন বিপদের মধ্যেও মাঝিকে তার চেনা মনে হচ্ছে। |
ঘ. চতুর্থ স্তবক (ওগো, তুমি কোথা যাও… কূলেতে এসো)
| চরণ | ব্যাখ্যা (ভাবানুবাদ) |
| ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে, / বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে। | কৃষক মাঝিকে অনুরোধ করছে- তুমি কোন দেশে যাচ্ছ? একবারের জন্য নৌকাটা কূলে ভেড়াও। |
| যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুশি তারে দাও- / শুধু তুমি নিয়ে যাও / ক্ষণিক হেসে / আমার সোনার ধান কূলেতে এসে। | তুমি যেখানে খুশি যেতে পারো, তোমার ইচ্ছামতো যাকে খুশি তাকে দিতে পারো। কিন্তু আমার সোনার ধানগুলো শুধু একবারের জন্য কূলে এসে হাসি মুখে নিয়ে যাও। (কৃষক তার সৃষ্টিকর্ম মাঝির হাতে অর্পণ করতে চাইছে)। |
ঙ. পঞ্চম স্তবক (যত চাও তত লও… করুণা করে)
| চরণ | ব্যাখ্যা (ভাবানুবাদ) |
| যত চাও তত লও তরণী-পরে। / আর আছে- নাই, দিয়েছি ভরে। | কৃষক মাঝিকে বলছে, তোমার তরণী-পরে যত ধান নিতে চাও, নাও। আমার আর কিছু অবশিষ্ট নেই, যা ছিল তার সবটাই ভরে দিলাম। |
| এতকাল নদীকূলে / যাহা লয়ে ছিনু ভুলে / সকলি দিলাম তুলে / থরে বিথরে- / এখন আমারে লহ করুণা করে। | এতকাল এই নদী কূলে যা নিয়ে ভুলে ছিলাম (সৃষ্টিকর্ম), তার সবটুকুই তোমার নৌকায় সুন্দরভাবে তুলে দিলাম। এখন আমাকে একটু করুণা করে তোমার সাথে নিয়ে যাও। |
চ. ষষ্ঠ স্তবক (ঠাঁই নাই… সোনার তরী)
| চরণ | ব্যাখ্যা (ভাবানুবাদ) |
| ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই- ছোট সে তরী / আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। | মাঝি উত্তর দিচ্ছে: এই ছোট নৌকায় আর জায়গা নেই। আমার নৌকাটি তোমার সোনার ধানেই ভরে গেছে। (মহাকাল কেবল মানুষের সৃষ্টিকর্মকেই গ্রহণ করে, ব্যক্তিসত্তাকে নয়)। |
| শ্রাবণগগন ঘিরে / ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, / শূন্য নদী-তীরে / রহিনু পড়ি- / যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী। | শ্রাবণের আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। কৃষক একা সেই শূন্য নদীর তীরে পড়ে রইলো। যা কিছু ছিল, তার সবটাই সোনার তরী নিয়ে চলে গেল। (কৃষক একা, তার সৃষ্টিকর্ম অমরত্ব লাভ করলো)। |
শব্দার্থ : সোনার তরী কবিতার নোট
| শব্দ | অর্থ |
| রাশি রাশি | অনেক। (নির্ধারক বিশেষণ) |
| ভারা ভারা | ধান স্তূপ আকারে রাখা। |
| ক্ষুরধারা | ক্ষুরের মতো ধারালো স্রোত। |
| খরপরশা | বর্ষার মতো তীব্র/প্রচণ্ড। |
| মসী মাখা | কালো ছায়া। |
| থরে বিথরে | সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে। |
| বারেক | একবার। |
এইচএসসি সোনার তরী কবিতার নোট ২০২৬ | PDF Download






